বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক চরম উত্তেজনাকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ভারত এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। গত শনিবার পাকিস্তানে আয়োজিত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোমবার থেকে এই প্রণালিতে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। পেন্টাগনের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দেশটির দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তেহরান। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সংকটের মধ্যেও ভারত ছিল হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যাদের ইরান ‘সেফ প্যাসেজ’ বা বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত শনিবার পর্যন্ত ভারতের পতাকাবাহী মোট ৯টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করে মুম্বাই ও দিল্লির টার্মিনালগুলোতে নোঙর করেছে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন এই ‘অবরোধ’ কর্মসূচি ভারতের জন্য অবশিষ্ট থাকা সামান্য সুযোগটুকুও বন্ধ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার অপেক্ষায় ভারতের আরও এক ডজনেরও বেশি পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে। সোমবার থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী যদি ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশকারী এবং সেখান থেকে বের হওয়া সমস্ত নৌ-চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে, তবে এই জাহাজগুলো মাঝসমুদ্রে আটকা পড়বে। এটি নয়াদিল্লিকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের একটি পক্ষ হতে বাধ্য করবে।
এদিকে, অভ্যন্তরীণভাবে ভারতে জ্বালানি ও গ্যাসের তীব্র সংকট শুরু হয়েছে। মজুদ ফুরিয়ে আসায় নয়াদিল্লি সরকার বাণিজ্যিক খাতের পরিবর্তে সাধারণ পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সংকটে দেশটির অসংখ্য রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। তেলের দাম এবং রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, মুম্বাই ও দিল্লির মতো মেগাসিটিগুলো থেকে অভিবাসী শ্রমিকেরা কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভারত সরকার এই প্রণালি ব্যবহারের জন্য ইরানকে কোনো প্রকার ‘টোল’ বা অর্থ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও, ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান নয়াদিল্লি ও তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান ‘ডিপ্লোম্যাটিক’ বা কূটনৈতিক চুক্তির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন অবরোধের এই নতুন সমীকরণ ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।