স্পেনে ৫ লাখ অভিবাসীর জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’: বৈধ হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ পেলেন বাংলাদেশিরা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে যখন অভিবাসন নিয়ে কড়াকড়ি বাড়ছে, ঠিক তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে হেঁটে বিশ্বকে চমকে দিল স্পেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকার এক ঐতিহাসিক ডিক্রি জারির মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ নথিহীন অভিবাসীকে বৈধ করার এক বিশাল ‘অ্যামনেস্টি’ বা সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচির অনুমোদন দিয়েছে। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যার ফলে স্পেনের অর্থনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে শ্রম দেওয়া অনিয়মিত প্রবাসীরা এখন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও আইনি স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছেন।

স্পেন সরকারের এই বিশেষ উদ্যোগটি আগামী ১৬ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী এলমা সাইজ জানিয়েছেন, ১৬ এপ্রিল থেকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ শুরু হবে এবং ২০ এপ্রিল থেকে সশরীরে আবেদন করা যাবে। আবেদন করার এই বিশেষ সুযোগটি আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে।

তবে এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় আসার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্তাবলি আরোপ করেছে স্পেন সরকার। নতুন এই কর্মসূচির বিধি অনুযায়ী, আবেদনকারীকে অবশ্যই ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে স্পেনে প্রবেশ করতে হবে। এছাড়া দেশটিতে অন্তত ৫ মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাস করার প্রমাণ দাখিল করতে হবে। আবেদনকারীর নামে স্পেনে বা তাঁর নিজ দেশে কোনো ধরনের ফৌজদারি বা অপরাধের রেকর্ড (Criminal Record) থাকা চলবে না। যেসব প্রবাসীর সাময়িক আবেদন মঞ্জুর হবে, তাঁরা প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য স্পেনে বসবাস ও কাজের অনুমতি (Work Permit) পাবেন। এই এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁরা স্থায়ী আবাসন ও পূর্ণাঙ্গ নাগরিক সুবিধার জন্য পুনরায় আবেদন করার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ অত্যন্ত সুকৌশলে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন। স্পেনের পার্লামেন্টে তাঁর সরকারের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় এবং এর আগে আইনসভায় এ সংক্রান্ত একটি বিল পাসের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায়, তিনি এবার ‘ডিক্রি’ জারির মাধ্যমে আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি এই আদেশ জারি করেছেন। মূলত স্পেনের জনমিতিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সৃষ্ট শ্রমিক সংকট মেটাতে এই অভিবাসীদের কাজে লাগাতে চায় মাদ্রিদ। সানচেজের মতে, এই পদক্ষেপ একটি ‘ন্যায়সংগত ও প্রয়োজনীয়’ কাজ।

অবশ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে স্পেনের প্রধান বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ (PP)। দলটির নেতা আলবার্তো নেজ ফেইহো এই উদ্যোগকে ‘অমানবিক ও অনিরাপদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে দেশটির বামপন্থী দলগুলো এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে।

স্পেন সরকারের এই ঘোষণায় আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের জোয়ার বইছে সেখানে থাকা বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝে। বিশেষ করে বার্সেলোনা ও মাদ্রিদে থাকা হাজার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী এই খবর শোনার পর খুশিতে একে অপরকে মিষ্টি মুখ করিয়েছেন। বার্সেলোনায় অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসী মুরুল ওয়াইদ আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এখানে কাজ নেই, মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই—জীবনযাপন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন বৈধ হওয়ার সুযোগ আসার খবরে আমরা সবাই অত্যন্ত আনন্দিত। আমরা প্রধানমন্ত্রী সানচেজকে ধন্যবাদ জানাই।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গণ-বৈধকরণের ফলে স্পেনের জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর বা ট্যাক্স বাবদ আয়ের পরিমাণও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ৫ লাখ মানুষের এই বড় সুযোগটি স্পেনের অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।