রণক্ষেত্র থেকে ফিরল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: কার জয় হলো এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে?

দীর্ঘ ৪০ দিনের রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা ও ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দুই সপ্তাহের এই প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া মহাপ্রলয়ের আপাতত অবসান ঘটল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল গোটা বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা ও পণ্য সরবরাহ চেইন।

এই ৪০ দিনের লড়াইয়ে উভয় পক্ষই সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি একে অপরের তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় ভয়াবহ হামলা চালায়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর কালো মেঘ ঘনীভূত হয়। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেন যে, হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ‘ইরানি সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। ট্রাম্পের এমন আগ্রাসী বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কা ও চরম মানবিক বিপর্যয়ের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে আসা যুদ্ধবিরতির খবরটি বিশ্ববাসীকে বড় ধরনের স্বস্তি দিয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে এবং বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা বা ‘তেজি ভাব’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়ায় পূর্ণাঙ্গ শান্তি নিয়ে এখনো সংশয় কাটেনি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, সকল পক্ষকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। এই অঞ্চলে একটি ‘স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ’ শান্তি নিশ্চিত করতে হলে যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা জরুরি। এই সংকট নিরসনে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা আশা করছেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধবিরতিকে তাদের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ হিসেবে দাবি করলেও ইরান একে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী ইরানের সাধারণ জনগণ। বিশ্বের প্রবল ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত আক্রমণের মুখেও ইরানিদের ইস্পাতকঠিন ঐক্য ও সংহতি ছিল নজিরবিহীন। এই যুদ্ধে প্রায় দুই হাজার ইরানি প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি বিশাল অংশই নিরপরাধ নারী ও শিশু। যুদ্ধবিরতির খবর প্রচার হওয়ার সাথে সাথে তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলোর রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। তাদের বিজয় উল্লাসই বলে দেয়, এই শান্তি তাদের কাছে কতটা কাঙ্ক্ষিত ছিল।

উল্লেখ্য, পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে এই হামলা শুরু করেছিল, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলায় দুই শতাধিক নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু এবং হাসপাতাল ও ঐতিহাসিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই ধ্বংসযজ্ঞ আবারও প্রমাণ করল যে, জবরদস্তি বা সামরিক আগ্রাসন নয়, বরং কূটনীতিই দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের উত্তাপ লেগেছিল বাংলাদেশেও। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন বাংলাদেশি প্রবাসী। এছাড়া জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে চড়া দামে তেল ও গ্যাস কিনতে হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছিল। সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর পরিবারগুলো ছিল চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে। চলমান এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী রূপ না পেলে কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বকেই দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া