একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী কি তবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পরিবর্তে এক ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে? আন্তর্জাতিক অস্ত্র গবেষণা সংস্থা ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (সিপ্রি)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অন্তত তেমনই এক অশনিসংকেত দিচ্ছে। আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল) প্রকাশিত এই রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি (২.৯ ট্রিলিয়ন) মার্কিন ডলারে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, টানা ১১ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী এই সমর-বাজেট বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা আধুনিক মানব সভ্যতার নিরাপত্তার জন্য বড় এক প্রশ্নচিহ্ন।
গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অসম প্রতিযোগিতাই এই ব্যয় বাড়ার প্রধান অনুঘটক। সামরিক খাতে খরচের এই দৌড়ে বরাবরের মতোই শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। গত বছর এই তিন শক্তিধর দেশ সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা সমগ্র বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি।
২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ২.৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের মাঝে একটি ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও গত বছর ওয়াশিংটন তাদের সমর-ব্যয় কিছুটা কমিয়ে ৯৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে নামিয়ে এনেছে (২০২৪ সালের তুলনায় ৭.৫ শতাংশ কম)। মূলত ইউক্রেনে নতুন করে বড় কোনো সামরিক সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন না হওয়ায় এই সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি কেবলই ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। মার্কিন কংগ্রেস ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের জন্য ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি বরাদ্দ অনুমোদন করেছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে ২০২৭ সালে এই খরচ ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইউরোপ মহাদেশে সামরিক ব্যয়ের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পুরো মহাদেশে সামরিক খরচ ১৪ শতাংশ বেড়ে ৮৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সিপ্রির গবেষক লরেনৎসো স্কারাৎসাতো জানিয়েছেন, ইউরোপের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে তাঁদের নিরাপত্তার জন্য কেবল আমেরিকার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ফলে জার্মানির মতো দেশ ২৪ শতাংশ বাজেট বাড়িয়ে ১১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। স্পেনের সামরিক বাজেটও নাটকীয়ভাবে ৫০ শতাংশ বেড়েছে, যা ১৯৯৪ সালের পর দেশটির মোট জিডিপির ২ শতাংশের ঘর অতিক্রম করল।
যুদ্ধরত দুই দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন তাঁদের অর্থনীতির সিংহভাগই এখন কামানের গোলায় ঢালছে। রাশিয়ার সামরিক ব্যয় ৫.৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার কোটি ডলার (জিডিপির ৭.৫ শতাংশ)। অন্যদিকে, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে থাকা ইউক্রেন তাঁদের জিডিপির রেকর্ড ৪০ শতাংশ বা ৮ হাজার ৪১০ কোটি ডলার ব্যয় করছে প্রতিরক্ষা খাতে।
এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলেও উত্তেজনার পারদ ঊর্ধ্বমুখী। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তিকে হুমকি হিসেবে দেখে জাপান ও তাইওয়ানও পাল্লা দিয়ে বাজেট বাড়াচ্ছে। জাপান তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ৯.৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরান কিছুটা ব্যয় কমালেও তা মূলত গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে হয়েছে; যদিও সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটি বারুদের স্তূপেই দাঁড়িয়ে আছে।
সব মিলিয়ে সিপ্রির এই রিপোর্ট বিশ্বনেতাদের জন্য এক কঠোর বার্তা। যখন বিশ্ব অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি আর জলবায়ু সংকটে জর্জরিত, তখন দেশগুলোর এই ‘অস্ত্র বিলাস’ উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্বের মানুষের জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবী এখন নিজেকে কতটা অনিরাপদ ভাবছে, বৈশ্বিক জিডিপির সাথে সামরিক ব্যয়ের এই ক্রমবর্ধমান অনুপাতই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।