মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক আকাশ যখন ইরান যুদ্ধের কালো মেঘে আচ্ছন্ন, তখন এই সংঘাতের এক অপ্রত্যাশিত ও বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে এবং ক্রেতারা মরিয়া হয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধান করছেন। এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা রাশিয়ার তেল এখন বিশ্ববাজারে পুনরায় ‘সোনার হরিণ’ হয়ে উঠেছে, যা মস্কোর অর্থনীতিকে নতুন অক্সিজেন জোগাচ্ছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার ওপর পাহাড়সম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তেলের দামের ওপর ‘প্রাইস ক্যাপ’ বা সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, বীমা এবং আর্থিক লেনদেনে কড়াকড়ির মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিলে টান ধরানো। এসব বাধার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়াকে ক্রেতা আকর্ষণ করতে আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১০ থেকে ১৩ ডলার ‘ডিসকাউন্ট’ বা ছাড়ে তেল বিক্রি করতে হয়েছে। তবে বর্তমানের ইরান যুদ্ধ সেই দৃশ্যপট আমূল বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হওয়ার হুমকিতে জাহাজ চলাচল কমে গেছে এবং বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে রাশিয়া। দীর্ঘদিনের বাণিজ্য পথ ও শক্তিশালী রপ্তানি সক্ষমতার কারণে তারা দ্রুত এই সরবরাহ ঘাটতি পূরণে সক্ষম হয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, যেখানে আগে ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করতে হতো, সেখানে এখন চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বর্তমানে ভারতের কাছে সরবরাহের ক্ষেত্রে রুশ তেল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট’-এর তুলনায় প্রতি ব্যারেলে ৪ থেকে ৫ ডলার বেশি দামে বা ‘প্রিমিয়াম’ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিশ্ব তেলের বাজারের এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত পরিবর্তন।
সবচাইতে কৌতূহলজনক বিষয় হলো এই সংকটে ওয়াশিংটনের অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে একঘরে করার চেষ্টা করলেও, ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা এখন হোয়াইট হাউসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভারতকে বিশেষ ৩০ দিনের একটি ‘ডেডলাইন’ বা ছাড় দিয়েছে, যাতে সাগরে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ রুশ তেল কিনতে কোনো আইনি বাধা না থাকে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন এই পদক্ষেপগুলো সাময়িক এবং সীমিত পরিসরে নেওয়া হয়েছে, তবে এটি মূলত রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সংকটকে নিজেদের অর্থনীতির জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার নোভাক অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন যে, এশীয় ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে রাশিয়া যেকোনো সময় সরবরাহ বাড়াতে প্রস্তুত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “রুশ তেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং কেউ কিনতে চাইলে আমরা অবশ্যই তা বিক্রি করব।” মূলত মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ রাশিয়ার রাজকোষকে এমন এক সময়ে সমৃদ্ধ করছে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব মস্কোকে পঙ্গু করে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভূ-রাজনীতির এই নয়া সমীকরণ এখন পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে এক জটিল ধাঁধার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।