বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শহর নিউইয়র্কের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন মেয়র জোহরান মামদানির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন নিয়ে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে আগে থেকেই প্রতিপক্ষের নিশানায় থাকা এই মেয়র এবার নতুন করে বিপাকে পড়েছেন তাঁর স্ত্রী রামা দুওয়াজির একটি পুরোনো চিত্রকর্ম বা ইলাস্ট্রেশনকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ উঠেছে, মামদানির স্ত্রী ফিলিস্তিনি লেখিকা সুসান আবুলহাওয়ার একটি সংকলনের জন্য কাজ করেছিলেন, যা নিয়ে মার্কিন রক্ষণশীল মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন ফ্রি বিকন’-এর একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। তারা দাবি করে, মেয়রের ২৮ বছর বয়সী স্ত্রী ও ফ্রিল্যান্স চিত্রকর রামা দুওয়াজি মূলত আবুলহাওয়ার সংকলিত ‘এভরি মোমেন্ট ইজ আ লাইফ’ নামক গাজার লেখকদের একটি সংকলনে অলঙ্করণ করেছিলেন। বিশেষভাবে সেখানে ‘এ ট্রেইল অব সোপ’ নামক একটি ছোটগল্পের জন্য তিনি চিত্রকর্ম তৈরি করেন, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বেদনার কথা তুলে ধরেছিল।
এই বিতর্কিত বিষয়টি সামনে আসার পর মেয়র জোহরান মামদানি আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানিয়েছেন যে, তাঁর স্ত্রী সরাসরি সুসান আবুলহাওয়ার সাথে কোনো যোগাযোগ করেননি। বরং তিনি একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পেশাদার শিল্পী হিসেবে এই প্রজেক্টের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। আবুলহাওয়াও পরবর্তীতে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুসান আবুলহাওয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পুরোনো পোস্ট। সমালোচকদের দাবি, সেই পোস্টগুলো ইহুদি-বিদ্বেষী। আবুলহাওয়া গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে ‘জুইশ সুপ্রিমেসিস্ট জেনোসাইড’ বা ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর ঘটনাকে একটি ‘চমকপ্রদ মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র মামদানি আবুলহাওয়ার মন্তব্যগুলোকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘ঘৃণ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর প্রশাসন যে কোনো ধরনের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে। তবে মেয়রের এমন রক্ষণাত্মক প্রতিক্রিয়া তাঁর ফিলিস্তিনপন্থী সমর্থকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছে। মানবাধিকার কর্মী শায়েল বেন-ইফ্রাইম কড়া সমালোচনা করে বলেন, “ক্ষমা চাওয়া ও ব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে মামদানি আসলে বোকামি করেছেন। জায়োনিস্ট বা জায়নবাদীদের সন্তুষ্ট করা কখনোই সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, লেখিকা সুসান আবুলহাওয়া মামদানির এই পিছু হটাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, মেয়র মামদানি এমন এক অশুভ শক্তির কাছে নতি স্বীকার করেছেন যারা তাঁকে এবং তাঁর প্রতিভাবান স্ত্রীকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে গ্রাস করতে চায়। উল্লেখ্য, মেয়র মামদানি দীর্ঘ সময় ধরেই আমেরিকায় ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামবিদ্বেষের শিকার হয়ে আসছেন। রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল সম্প্রতি মামদানির ইফতার করার ছবির পাশে ৯/১১ হামলার ছবি যুক্ত করে একটি প্ররোচনামূলক পোস্ট দিয়ে লেখেন, ‘শত্রু এখন ভেতরে ঢুকে গেছে।’ এমন প্রকাশ্য ধর্মীয় বিদ্বেষের পরও ওই সিনেটর কোনো ধরণের জবাবদিহিতার মুখে না পড়ায় মার্কিন বিচারব্যবস্থা ও রাজনীতিতে দ্বিচারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সব মিলিয়ে জোহরান মামদানি এখন স্ত্রী, আদর্শ এবং ক্ষমতার ত্রিমুখী চাপে এক কঠিন সময় পার করছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।