মানবজাতির মহাকাশ জয়ের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আবারও চাঁদের কোল ঘেঁষে ঘুরে আসার অবিশ্বাস্য মিশন সম্পন্ন করে আজ নিরাপদে নীল গ্রহে ফিরে এসেছেন চার জন সাহসী নভোচারী। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) বহুল প্রতীক্ষিত ‘আর্টেমিস-২’ (Artemis II) মিশনের এই সফল প্রত্যাবর্তনকে চাঁদ ও পরবর্তী মঙ্গল অভিযানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশ মিডিয়ার পাঠকদের জন্য এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের বিস্তারিত প্রতিবেদন।
শনিবার (১১ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৭ মিনিটে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে বিশাল তিনটি প্যারাশুটের মাধ্যমে ওরিয়ন (Orion) মহাকাশযানটি সজোরে আছড়ে পড়ে (Splashdown)। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল নাসার বিশেষ উদ্ধারকারী দল। অবতরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই আধুনিক হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী নৌযান ব্যবহার করে নভোচারীদের নিরাপদে উপকূলে সরিয়ে নেওয়া হয়। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ওরিয়ন মহাকাশযানটি প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম হয়েছে, যা মহাকাশযানের ‘হিট শিল্ড’ (Heat Shield)-এর সক্ষমতার এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা ছিল।
১০ দিনের এই ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করার পর তারা ১০ দিনে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯৭২ সালের ‘অ্যাপোলো-১৭’ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানুষবাহী মহাকাশযান চাঁদের এত কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হলো। এই মিশনেই মানুষ পৃথিবী থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করার নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছে।
অভিযান চলাকালে এই চার নভোচারী চাঁদের সেই অদেখা ও রহস্যময় ‘ডার্ক সাইড’ বা দূরবর্তী পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করেছেন। এছাড়া গভীর মহাকাশে (Deep Space) দীর্ঘ সময় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও সম্পন্ন করেছেন তারা। নাসার এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই এখন পরবর্তী ‘আর্টেমিস-৩’ মিশনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর আবারও চাঁদের মাটিতে পা রাখবে মানুষ।
বর্তমানে চার নভোচারীকে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ‘মেডিক্যাল চেকআপ’ করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় মহাকাশের ওজনহীনতায় থাকার পর তাদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এরপর তারা দ্রুতই টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত জনসন স্পেস সেন্টারে ফিরে যাবেন। সেখানে দীর্ঘ বিশ্লেষণ ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এই মিশনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, আর্টেমিস-২ মিশনের এই অভূতপূর্ব সাফল্য প্রমাণ করল যে—মানুষ এখন শুধু পৃথিবীর কক্ষপথে নয়, বরং অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুতে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখার জন্য প্রস্তুত।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।