কেনিয়ায় প্রকৃতির রুদ্ররূপ: বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৬, পানির নিচে রাজধানী নাইরোবি

আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় ভারী বর্ষণ ও তার ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে দেশটিতে বন্যার তোড়ে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৬৬ জনে। কেনিয়া পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রাজধানী নাইরোবিসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এখন কার্যত পানির নিচে, যেখানে নিদারুণ মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজার হাজার নাগরিক।

গত রোববার রাতভর রাজধানী নাইরোবিতে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কেনিয়া রেডক্রস জানিয়েছে, বৃষ্টির ফলে পানির স্তর দ্রুত বাড়তে থাকায় শহরের একটি নিচু এলাকায় ‘মাতাতু’ নামে পরিচিত একটি স্থানীয় মিনিবাস ট্যাক্সি আটকা পড়ে। তবে উদ্ধারকর্মীদের প্রচেষ্টায় সেখান থেকে ১১ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া অন্য একটি বন্যাকবলিত বাড়ি থেকে দুই শিশুকে নিরাপদে সরিয়ে এনেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।

গত সপ্তাহের টানা বর্ষণে কেনিয়ার নদ-নদীগুলোর পানি উপচে পড়ে আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদ তলিয়ে গেছে। এর ফলে অসংখ্য কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ লাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাইরোবিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেতু বন্যার তোড়ে ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং কয়েকটি স্কুল কক্ষের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক জরুরি সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এখনো ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে, যা বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারি নির্দেশনায় নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে রাজধানী নাইরোবি, যেখানে এখন পর্যন্ত ৩৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শহরটির দুর্বল পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ‘ড্রেনেজ সিস্টেম’ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণেই পরিস্থিতি এমন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। নাইরোবির পার্কল্যান্ডস এলাকার ব্যবসায়ী করিম হাসান আলী তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের সামনে প্রায় সাড়ে ছয় ফুট পানি জমে গিয়েছিল, যার ফলে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে থাকা গাড়িগুলো পুরোপুরি ডুবে যায়। অন্য এক বাসিন্দা দিনেশ প্যাটেল অভিযোগ করেন, যথাযথ ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামো না থাকায় প্রতি বছরই তাঁদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো জানিয়েছেন, সরকার বর্তমানে বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কার করতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে। যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অনেক জায়গায় মানুষ নিজ উদ্যোগেই আবর্জনা পরিষ্কার করে পানি সরানোর চেষ্টা করছে।

উল্লেখ্য, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল কেনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেশী দেশ ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলেও বন্যা ও ভূমিধসের কারণে ইতিমধ্যে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় পূর্ব আফ্রিকায় এমন চরম মাত্রার বৃষ্টিপাত ও অকাল বন্যার ঘটনা বারবার ঘটছে। কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি এখন পুরো অঞ্চলের জন্য এক বড় মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।