ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তা ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও এর নেতিবাচক প্রভাব বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই উদ্বেগজনক পূর্বাভাস তুলে ধরেন।
অজয় বাঙ্গা তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতি যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকরও হয়, তবুও সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ক্ষতগুলো পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি কোনো কারণে এই যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির মাত্রা কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যাবে।” বিশ্বব্যাংকের গাণিতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ধরে নেওয়া হয়, তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা ‘গ্রোথ’ ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। তবে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হলে এবং সংঘাত না থামলে এই প্রবৃদ্ধি কমার হার প্রায় ১ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে।
বিশ্বব্যাংক প্রধানের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর। তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বা ‘ইনফ্লেশন’ ২০০ থেকে ৩০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর যদি পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যায়, তবে মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৯ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর (EMDEs) জন্য এই সংবাদ আরও বেশি উদ্বেগের। বিশ্বব্যাংক এই দেশগুলোর জন্য ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.৬৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার চরম পরিস্থিতিতে এই হার ২.৬ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যা সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলোকে ব্যাহত করবে। এছাড়া এসব দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে; যেখানে আগে ৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছিল, এখন তা বেড়ে ৪.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং চরম পরিস্থিতিতে তা ৬.৭ শতাংশ পর্যন্ত ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে, যা বিশ্বজুড়ে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া ‘সাপ্লাই চেইন’ বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কবলে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া