ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দীর্ঘকাল ধরে চলা ইসরায়েলি অবরোধ ছিন্ন করতে এবং অবরুদ্ধ মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ পৌঁছে দিতে এক নজিরবিহীন বৈশ্বিক সামুদ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে জানানো হয়েছে, আগামী ১২ এপ্রিল স্পেনের বার্সেলোনা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে 'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা'। এই ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসী মিশনে যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিসের সুপরিচিত এবং শক্তিশালী জাহাজ ‘আর্কটিক সানরাইজ’।
বিশ্বের ৭০টিরও বেশি রাষ্ট্র থেকে আসা প্রায় এক হাজারেরও বেশি অধিকারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী এবং ৭০টি ছোট-বড় নৌযান নিয়ে পরিচালিত এই অভিযানটি হতে যাচ্ছে মানব ইতিহাসের বৃহত্তম বেসামরিক সামুদ্রিক প্রতিরোধ। এই বিশাল নৌবহরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকছে মালয়েশিয়ার ‘৩০ কন্টেইনার মানবিক সহায়তা মিশন’, যা গাজাবাসীর জন্য অতিপ্রয়োজনীয় ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী বহন করবে।
কেবল ত্রাণ সরবরাহ নয়, এই বহরটিতে থাকছেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক, শিক্ষক এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ প্রকৌশলীরা। তাদের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যসেবা সচল করা এবং টেকসই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা রাখা। এরই মধ্যে স্প্যানিশ এনজিও প্রোক্টিভা ওপেন আর্মস-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ওপেন আর্মস’ এই মিশনে সংহতি জানিয়ে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা গাজাবাসীর প্রতি বিশ্ববিবেকের নজিরবিহীন ঐক্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আয়োজকরা গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখছেন না, বরং একে বর্ণনা করেছেন একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে। ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজার উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান, কৃষি ব্যবস্থা এবং পানি ব্যবস্থাপনা যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তাকে প্রতিবেদনে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশগত গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্রিনপিস মেনা-এর নির্বাহী পরিচালক ঘাওয়া নাকাত এই প্রসঙ্গে বলেন, "আমাদের এই মিশনে অংশগ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো গাজায় কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং চলমান যুদ্ধাপরাধ ও জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সোচ্চার হওয়া।"
অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘আর্কটিক সানরাইজ’ জাহাজটি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় পুরো বহরটিকে অত্যাবশ্যকীয় কারিগরি ও অপারেশনাল নিরাপত্তা প্রদান করবে। বিশেষ করে গাজার উপকূলের শেষ ২০০ নটিক্যাল মাইল অতিক্রম করার সময় যে কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা প্রস্তত। আগামী ১২ এপ্রিল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশিষ্ট প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বার্সেলোনা থেকে এই যাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। বিশ্বশক্তিগুলোর রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে চরম উদাসীনতার প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের এই সম্মিলিত উদ্যোগই এখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া