ওরিয়ন মহাকাশযানে যখন ‘স্পেস প্লাম্বার’ ক্রিস্টিনা কচ: এক শৌচাগার ও কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা

পৃথিবী থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে, ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে একটি ক্ষুদ্র যানে ভেসে চলেছেন চারজন সাহসী অভিযাত্রী। নাসা’র ঐতিহাসিক আর্টেমিস-২ মিশনে থাকা এই নভোচারীরা এখন চাঁদের চারপাশে চক্কর দিয়ে পৃথিবীতে ফেরার পথে রয়েছেন। তবে মহাকাশে তাঁদের এই যাত্রা কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা মহাজাগতিক বিস্ময় দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষুদ্র এক পরিসরে দৈনন্দিন জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হচ্ছে তাঁদের। ওরিয়ন নামক এই মহাকাশযানটির ভেতরের আয়তন মাত্র দুটি মিনিভ্যানের সমান, আর এই সংকীর্ণ জায়গাতেই চলছে তাঁদের ১০ দিনের এক রোমাঞ্চকর ‘ক্যাম্পিং ট্রিপ’।

অভিযান বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কচ এই যাত্রার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে জানিয়েছেন, এটি অনেকটা দীর্ঘ ভ্রমণের পরিকল্পনার মতো। মহাকাশযানে তাঁদের খাবারের তালিকায় রয়েছে ৫৮টি টরটিলা রুটি, ৪৩ কাপ কফি এবং মুখরোচক বারবিকিউ বিফ ব্রিসকেট। এমনকি খাবার সুস্বাদু করতে তাঁরা সঙ্গে নিয়েছেন ৫ ধরনের ‘হট সস’। নাসার প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা গেছে, শূন্যে ভেসে ভেসেই নভোচারীরা কখনো স্মুদিতে চুমুক দিচ্ছেন, আবার কখনো ই-মেইল সংক্রান্ত ঝামেলা মেটাচ্ছেন।

তবে এই অভিযানের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মহাকাশযানের একমাত্র শৌচাগারটি। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে অ্যাপোলো মিশনগুলোতে কোনো শৌচাগার ছিল না; নভোচারীদের বর্জ্য সংগ্রহের ব্যাগ ব্যবহার করতে হতো। এবার ওরিয়ন মহাকাশযানে প্রথমবারের মতো উন্নত শৌচাগার স্থাপন করা হলেও মাঝপথে তাতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ নিজেই সেটি মেরামত করেন। হাসতে হাসতে তিনি নিজেকে ‘স্পেস প্লাম্বার’ হিসেবে দাবি করে বলেন, “এটি মহাকাশযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। এটি সচল হওয়ার পর আমরা সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি।” শৌচাগারটি ব্যবহারের সময় প্রবল শব্দ হয় বলে নভোচারীদের কানে সুরক্ষাযন্ত্র পরতে হয়। তবে কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন জানিয়েছেন, মহাকাশযানে এটিই একমাত্র জায়গা যেখানে কিছুটা সময় একা থাকা যায়।

মহাকাশে ঘুমানোর পদ্ধতিটিও বেশ অদ্ভুত। নভোচারীরা দেয়ালে বাঁধা বিশেষ স্লিপিং ব্যাগে ঘুমান যাতে শূন্যে ভেসে না যান। মিশন কমান্ডার রিড উইজম্যান জানান, ক্রিস্টিনা কচ মহাকাশযানের মাঝখানে মাথা নিচের দিকে করে ঘুমান, যা দেখতে অনেকটা ‘ঝুলে থাকা বাদুড়ের মতো’। তবে তিনি দাবি করেছেন, এটি সাধারণ বিছানার চেয়েও অনেক বেশি আরামদায়ক।

প্রযুক্তিগত ঝামেলার বাইরে নভোচারীদের শারীরিক সুস্থতার দিকেও দিতে হয় কড়া নজর। হাড় ও পেশির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ‘ফ্লাইহুইল এক্সারসাইজ ডিভাইস’ ব্যবহার করে ব্যায়াম করতে হয় তাঁদের। নাসা এবার তাঁদের স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছে, যাতে তাঁরা পরিবারের সঙ্গে বিশেষ মুহূর্তগুলো শেয়ার করতে পারেন।

সব মিলিয়ে এই অভিযানে একদিকে যেমন রয়েছে পেশাদারিত্বের চাপ, অন্যদিকে রয়েছে শিশুসুলভ আনন্দ। চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাওয়া ভিক্টর গ্লোভার জানান, উৎক্ষেপণের সময় তাঁর ভেতরের শিশুসত্তাটি আনন্দে নেচে উঠেছিল। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা আর জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ সমস্যার সংমিশ্রণে ওরিয়ন মহাকাশযানে নভোচারীদের এই জীবন এখন সারা বিশ্বের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।