ইউরেশিয়ায় রাশিয়ার নতুন মহাপরিকল্পনা: পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাব

বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণের আবহে ইউরেশিয়া অঞ্চলে এক নতুন এবং সুদূরপ্রসারী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। মস্কোর এই প্রস্তাবিত কাঠামোর মূল ভিত্তি হবে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিপক্ষে পরিচালিত হবে না। রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা।


সম্প্রতি উজবেকিস্তানে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল গালুজিন এই প্রস্তাবনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। 'ভ্যালদাই ডিসকাশন ক্লাব' এবং উজবেক প্রেসিডেন্টের অধীনস্থ 'ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টাররিজিওনাল স্টাডিজ'-এর যৌথ উদ্যোগে ‘রাশিয়া-উজবেকিস্তান: ইউরেশিয়ায় কৌশলগত অংশীদারত্ব’ শীর্ষক এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গালুজিন স্পষ্ট করেন যে, ইউরেশিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা হওয়া উচিত অত্যন্ত বিস্তৃত এবং উন্মুক্ত।


রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, প্রতিটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এমন একটি ‘ইকুয়াল সিকিউরিটি’ বা সমান নিরাপত্তার নীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে একটি দেশ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে অন্য কোনো দেশের ক্ষতি করবে না। তিনি জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘ দিন ধরে যে ‘বৃহত্তর ইউরেশীয় অংশীদারত্ব’ (Greater Eurasian Partnership)-এর কথা বলে আসছেন, এই নতুন কাঠামোটি মূলত তারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বর্তমানে এটি রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


এই প্রস্তাবের সাথে উজবেকিস্তানের নিজস্ব ‘উজবেকিস্তান ২০৩০’ কৌশলেরও এক অভাবনীয় মিল রয়েছে বলে সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। এই সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা, আর্থিক লেনদেনে সমন্বয় আনা এবং বাণিজ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো ট্যারিফ বা প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা। মূলত মধ্য এশিয়া এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের (Global South) দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল প্রেরণা।


মিখাইল গালুজিন তার বক্তব্যে বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ইউরেশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের উন্নয়ন ও সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই নিতে হবে। বিশেষ করে বাইরের কোনো শক্তির সামরিক, রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এই লক্ষ্যে ওই অঞ্চলে বিদ্যমান প্রভাবশালী সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়। এই তালিকায় রয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ (সিআইএস), রাশিয়া-বেলারুশ ইউনিয়ন স্টেট, ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন (ইএইইউ), কালেক্টিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন (সিএসটিইউ) এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)।


উল্লেখ্য, উজবেকিস্তান ইতিমধ্যেই এই সংস্থাগুলোর বেশ কয়েকটির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। রাশিয়ার এই নতুন প্রস্তাবনাটি কার্যকর হলে ইউরেশীয় অঞ্চলে মস্কোর কৌশলগত অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে এবং বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিকল্প গড়ে উঠবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।