বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সমুদ্রের নীল জলরাশিতে এখনো কাটছে না উত্তেজনার পারদ। লেবাননের সঙ্গে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরান এই জলপথটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করার কথা জানালেও শুক্রবার রাতে সেখানে এক রহস্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ২০টি জাহাজের একটি বড় বহর হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করেও শেষ মুহূর্তে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর এটিই ছিল এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।
ইরানের পক্ষ থেকে শুক্রবার জানানো হয়েছিল, লেবাননে চলমান যুদ্ধবিরতির সময়কাল পর্যন্ত এই নৌপথ দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ যাতায়াত করতে পারবে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করে এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে শুক্রবার সন্ধ্যার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তথ্য বলছে, ২০টি জাহাজের বহরটি প্রণালির খুব কাছাকাছি পৌঁছেও হঠাৎ গতি কমিয়ে দেয় এবং পরে ফিরে যায়। এই বহরে ফরাসি শিপিং জায়ান্ট ‘সিএমএ সিজিএম’ (CMA CGM) পরিচালিত তিনটি বিশাল কনটেইনার জাহাজও ছিল। জাহাজগুলো কেন হঠাৎ যাত্রা স্থগিত করল, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এদিকে, তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণ করবে ইরানের ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। আইআরজিসির নির্দেশনা ও তাদের নির্ধারিত ‘নিরাপদ রুট’ অনুসরণ করেই কেবল জাহাজগুলো চলাচল করতে পারবে। এমনকি মার্কিন মালিকানাধীন জাহাজও যাতায়াতের অনুমতি পাবে, তবে কোনো ধরনের সামরিক নৌযান বা যুদ্ধজাহাজ এই জলপথে প্রবেশ করতে পারবে না। সমুদ্রের তলদেশে পুঁতে রাখা মাইন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখনো গভীর উদ্বেগ ও সংশয় কাজ করছে।
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (IMO) মহাসচিব আরসেনিও ডোমিনগুয়েজ জানিয়েছেন, তাঁরা বর্তমানে এই নৌপথের নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচলের বিষয়টি নিবিড়ভাবে যাচাই করছেন। তবে শান্তি আলোচনার এই ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শনিবার আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরান জানিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রাখে, তবে যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর থেকে এই অঞ্চলটি এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দুই সপ্তাহের এবং গতকাল লেবাননের সঙ্গে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজের এই পিছু হটার ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির এই ‘লাইফলাইন’ এখনো পুরোপুরি বিপন্মুক্ত নয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।