আলোচনা চললেও চুক্তির আশা কি ফিকে? ইরানি স্পিকারের মন্তব্যে নতুন সংশয়

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশসীমা আর পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও একটি চূড়ান্ত ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো এখনো ‘বহু দূর’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ। আগামী ২১ এপ্রিল বর্তমান সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর এমন নেতিবাচক ও সতর্ক অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

শনিবার রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে গালিবাফ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইসলামাবাদে প্রথম দফা বৈঠকে কিছু বিষয়ে আলোচনা এগোলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনো পাহাড়সমান। তিনি বলেন, “আমরা এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা থেকে অনেক দূরে আছি। যদিও আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু কিছু মৌলিক ও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ (Strategic) বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।” মূলত ওয়াশিংটনের প্রতি চরম অবিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে দেন যে, যেকোনো মুহূর্তে এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও সরাসরি লড়াই শুরু হতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েলি শক্তির মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হওয়ার দীর্ঘ ৪০ দিন পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রথমবারের মতো দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে বসেছিল। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘আউটকাম’ বা ফলাফল ছাড়াই প্রথম দফার সেই বৈঠক শেষ হয়। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ২১ এপ্রিলের ডেডলাইন শেষ হওয়ার আগে দুই পক্ষকে পুনরায় মুখোমুখি বসাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও তেহরান সময় নির্ধারণে এখনো দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে।

রণক্ষেত্রের পরিস্থিতিও ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। ইসরায়েলি আর্মি রেডিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কায় ইসরায়েলি বাহিনীকে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ অবস্থায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কড়া অবরোধ বা ‘ব্লকেড’ (Blockade) কার্যকর করছে। এই অভিযানে ১২টির বেশি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ, রণতরি এবং ১০ হাজারেরও বেশি সেনাসদস্য সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। সেন্টকম দাবি করেছে, সমুদ্রসীমানায় কড়াকড়ির অংশ হিসেবে তারা ইতিমধ্যে ইরান-সংশ্লিষ্ট ২৩টি পণ্যবাহী জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং সেগুলোকে পুনরায় হরমুজ প্রণালির দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি নিয়েও চলছে ইঁদুর-বেড়াল খেলা। ইরান গতকাল সাময়িকভাবে এই নৌপথটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধের প্রতিবাদে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই তা আবারও বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই ‘ডেডলক’ বা অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে। সব মিলিয়ে ২১ এপ্রিলের আগে কোনো জাদুকরী সমাধান না এলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা অমূলক নয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।