স্বপ্ন যখন এএসপি: বাবার শূন্যতা আর দীর্ঘ লড়াই শেষে সাফল্যের শীর্ষে জাবেদ

নিউজ বডি:

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
অদম্য ইচ্ছা আর নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের কাছে হার মেনেছে সব প্রতিকূলতা। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর একের পর এক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেছেন মো. জাবেদ হোসেন। সম্প্রতি ঘোষিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। চারবারের নিরলস প্রচেষ্টায় নিজের পছন্দের ক্যাডারে জায়গা করে নেওয়া জাবেদ এখন বিসিএস প্রত্যাশীদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।

জাবেদ হোসেনের এই পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা এই মেধাবী শিক্ষার্থী তাঁর বিসিএস যাত্রা শুরু করেন ২০২১ সালের শেষের দিকে। ২০২২ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করলেও ৪৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে তিনি উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। তবে দমে যাননি তিনি। এরপর ৪৫তম বিসিএসে অংশ নিয়ে তিনি নন-ক্যাডার (ইনস্ট্রাক্টর) পদে সুপারিশ পান। ৪৬তম বিসিএসেও তিনি ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছান, কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম আসেনি। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে এসে ধরা দেয় সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। তাঁর ক্যাডার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিল প্রশাসন ও পুলিশ; আর তিনি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে।

স্নাতকে ৩.৮৭ সিজিপিএ অর্জন করা জাবেদ তাঁর প্রস্তুতির কৌশল সম্পর্কে জানান, তিনি শুরুতেই বিগত বছরের প্রশ্ন ও সিলেবাস পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন। প্রতিটি বিষয়ের সবল ও দুর্বল দিক চিহ্নিত করে দৈনিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে পড়াশোনা করতেন। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্য, গণিত এবং ইংরেজির শব্দভান্ডার আয়ত্ত করার জন্য তিনি রুটিনমাফিক কাজ করেছেন। জাবেদ মনে করেন, লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নোট তৈরি করা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। তবে তথ্যগুলো বইয়ে চিহ্নিত করে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো আগে শেষ করা তাঁকে সাফল্যের পথে এগিয়ে দিয়েছে।

তবে এই বিশাল অর্জনের আনন্দের মাঝে এক গভীর বিষাদ তাড়া করে বেড়াচ্ছে জাবেদকে। যে বাবার হাত ধরে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাবা এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (তথ্যসূত্র অনুযায়ী) পরলোকগমন করেছেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জাবেদ বলেন, “বাবা-মা আমাকে মানুষ করার জন্য জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় সংগ্রাম করেছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার হওয়া সত্ত্বেও বাবা আমাকে ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়েছেন। ধারদেনা করে সেমিস্টার ফি দিলেও আমাকে বুঝতে দিতেন না। কোনোদিন চাকরির জন্য চাপ দেননি, বরং সাহস জুগিয়েছেন। বাবার স্বপ্ন ছিল আমি বড় কিছু হব, আজ আমি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি কিন্তু বাবা তা দেখে যেতে পারলেন না।”

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার চরনদ্বীপের এই কৃতি সন্তান বর্তমানে সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তবে ৪৫তম বিসিএসে ইনস্ট্রাক্টর পদে সুপারিশ পেলেও সেখানে তাঁর যোগদান করা হয়নি।

নতুন প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে জাবেদ হোসেন পরামর্শ দিয়েছেন, বিসিএসের দীর্ঘ পথচলায় হতাশ হওয়া চলবে না। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রস্তুতির পাশাপাশি ক্যারিয়ারের বিকল্প পথ খোলা রাখা জরুরি। বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে একাধিক প্রকাশনীর পেছনে না ছুটে প্রিলিমিনারির জন্য একটি এবং লিখিত পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ দুটি মানসম্মত বই অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি। সেই সঙ্গে সমসাময়িক বিষয়ে ধারণা রাখতে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এই নবনির্বাচিত পুলিশ কর্মকর্তা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।