থামছে না ইয়েমেন যুদ্ধ: নেপথ্যে কি মার্কিন তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড লুটওয়াকের সেই বিতর্কিত ফর্মুলা?

 আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দেশ মিডিয়া: দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো পক্ষের চূড়ান্ত বিজয় যেন এক নিষিদ্ধ শব্দে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এখন একটি সুপরিকল্পিত ‘ক্ষয়িষ্ণু লড়াই’, যেখানে প্রতিটি পক্ষই তার প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে চায়, কিন্তু কেউই এমন বিজয় চায় না যা অঞ্চলের বিদ্যমান ভারসাম্যকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারে।

ইয়েমেনের এই বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৯৯ সালে মার্কিন কৌশলবিদ এডওয়ার্ড লুটওয়াকের দেওয়া ‘গিভ ওয়ার আ চান্স’ তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ২০১৩ সালে সিরিয়া সংকটের সময়ও এই একই কৌশলের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। লুটওয়াকের যুক্তি ছিল—সব যুদ্ধের সমাপ্তি মানেই শান্তি নয়। কখনো কখনো কৌশলগত স্বার্থের খাতিরে যুদ্ধকে অনির্দিষ্টকাল ধরে অচল অবস্থায় বা ‘স্টেলমেট’ পরিস্থিতিতে রাখাই সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ। সিরিয়ার ক্ষেত্রে যেমন বাশার আল-আসাদের জয় মানে ইরানের শক্তিবৃদ্ধি, আবার তার পতন মানে কট্টরপন্থীদের উত্থান—এই দ্বিধাই সংঘাতকে জিইয়ে রেখেছিল। ইয়েমেনের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে এক বাস্তব মহড়া দিচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব।

২০১৫ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হস্তক্ষেপের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বাসিত করা। কিন্তু দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও আজ পর্যন্ত হুতিরা পুরো দেশ দখল করতে পারেনি, আবার জোট বাহিনীও তাদের সানা থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ফ্রন্টলাইনগুলো স্থবির হয়ে আছে। এটি আসলে কোনো শান্তি নয়, বরং সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট সীমায় আটকে রাখার কৌশল।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের পূর্ণাঙ্গ বিজয় মানেই হলো সৌদি আরবের দীর্ঘ সীমান্তে ইরানের প্রভাব বলয় তৈরি হওয়া এবং বাব আল-মানদেব প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে মার্কিন-ইসরায়েলি স্বার্থ চরম ঝুঁকিতে পড়া। অন্যদিকে, হুতিদের একেবারে নির্মূল করাও কঠিন; কারণ তারা ইয়েমেনের সামাজিক ও উপজাতীয় কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হুতিদের পতন হলে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণের মতো একক কোনো শক্তি বর্তমানে দেশটিতে নেই। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী (এসটিসি) এবং মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘেঁষা ‘ইসলাহ’ পার্টির মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুতে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নেয়। বিশেষ করে এডেন ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে দক্ষিণ অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের (এসটিসি) প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রভাব বজায় রাখছে।

২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার জবাবে মার্কিন আক্রমণ এবং পরবর্তীতে ওমানের মধ্যস্থতায় সেই আক্রমণ থামিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হুতি শাসনের অবসান নয়, বরং তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। এই ‘নিয়ন্ত্রিত বিভাজন’ নীতি কেবল ইয়েমেনে নয়, বরং সুদান, লিবিয়া, ইরাক ও লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।

বর্তমানে এক অদ্ভুত ভারসাম্য বিরাজ করছে ইয়েমেনে। হুতিদের হাতে সানা, সরকারের হাতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ইরানের হাতে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রক কার্ড। এর মধ্যেই তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান অক্ষের মতো নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণ দেখা দিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি ফ্রন্টলাইনে না থেকে আড়ালে থেকেই যুদ্ধের সীমা নির্ধারণ করে দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ইয়েমেনিদের।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।