তীব্র দাবদাহে কেবল প্রকৃতিই তপ্ত হচ্ছে না, বরং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শ্রমজীবী মানুষের পকেটে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই চরম তাপপ্রবাহের কারণে কর্মঘণ্টা হারানো এবং স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার ফলে বছরে বাংলাদেশের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য।
রাজধানীর মণিপুরিপাড়ার ৫৬ বছর বয়সী রিকশাচালক আসাদুল ইসলামের জীবনগাথা এখন হাজারো শ্রমিকের প্রতিচ্ছবি। গত জুনের এক দুপুরে রিকশা চালানোর সময় তীব্র গরমে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। আসাদুল আক্ষেপ করে বলেন, "গরম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু আমার না, অনেকেরই এমন হচ্ছে।" কাজ শেষে রাতে যে একটু শান্তিতে ঘুমাবেন, সেই উপায়ও নেই। ছোট এক ঘরে গাদাগাদি করে থাকার ফলে দিনের জমা হওয়া তাপ রাতেও ঘরকে উত্তপ্ত করে রাখে, যা শ্রমিকদের বিশ্রামের সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (আইআইইডি) এবং ‘অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম’ (ওকাপ) যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। ‘টু হট টু ওয়ার্ক, টু পুওর টু রেস্ট’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র গরমের কারণে ঘরের বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ২৩.৭ কর্মদিবস এবং ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক ১৩.৫ কর্মদিবস হারাচ্ছেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪.৯ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। এসব শ্রমিকের আয় সরাসরি তাদের কাজের উপস্থিতি ও সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাপপ্রবাহের কারণে কাজ বন্ধ রাখা বা কাজের গতি কমে যাওয়ার অর্থই হলো সরাসরি আয় হারানো। দীপক নামের একজন নির্মাণশ্রমিক তার অভিজ্ঞতায় বলেন, "কখনো কখনো ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারি না। কংক্রিট থেকে ওঠা তাপে মনে হয় চামড়া পুড়ে যাচ্ছে।"
পরিসংখ্যান বলছে, ঘরের বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ১৪৮.৯ ডলার এবং ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক ৮৯.১ ডলার মজুরি হারাচ্ছেন। ঢাকায় জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মাসিক মজুরি যেখানে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা, সেখানে তাপজনিত কারণে আয় কমে যাওয়ায় বাইরের শ্রমিকরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬.৪ শতাংশ পিছিয়ে থাকছেন। আইআইইডির পরিচালক ঋতু ভরদ্বাজ জানান, এই বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি শ্রমিকদের নীরবে সহ্য করতে হয়; যার ফলে তারা সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণ নিতে বাধ্য হন।
স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি আরও ভয়াবহ। গবেষণায় অংশ নেওয়া ২৩.১ শতাংশ শ্রমিক কিডনিজনিত সমস্যার কথা জানিয়েছেন। গবেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপে কাজ করার ফলে প্রায় ৬ শতাংশ শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। অথচ হিটস্ট্রোকের শিকার হওয়া ২০ জন শ্রমিকের ১৯ জনই কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করেন না। আশুলিয়ার কেইপিজেড বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ডা. রাজীব হাসান জানান, গরমের মৌসুমে ডায়রিয়াজনিত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, যার সঙ্গে অতিরিক্ত তাপের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থনৈতিক মানদণ্ডে এই ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। তাপপ্রবাহে অসুস্থতা ও উৎপাদনক্ষমতা হ্রাসের কারণে দেশে বছরে প্রায় ১১৮ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের হারানো মজুরি প্রায় ৪১০ কোটি ডলার, যা জিডিপির ০.৯১ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ক্ষতি যোগ করলে এই অঙ্ক দাঁড়ায় ৬২২ কোটি ডলারে (প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা), যা জিডিপির ১.৩৮ শতাংশের সমান।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বিষয়টিকে একটি বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমজীবী গোষ্ঠী যে চরম সংকটে পড়েছে, তা এই গবেষণায় যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা শ্রম আইন সংশোধনের ওপর জোর দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহম্মদ বলেন, "তাপে কাজ করার ক্ষেত্রে নিরাপদ সীমা নির্ধারণ এবং বাধ্যতামূলক বিরতির বিধান আইনে যুক্ত করা জরুরি।" গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, তাপমাত্রাভিত্তিক নগদ সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মস্থলে ছায়া ও পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। প্রস্তাবিত এই সুরক্ষা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বছরে ৮৭৩ থেকে ১,৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা বর্তমান বিপুল ক্ষতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।