শোকের পরিক্রমায় পাশে আছে কি সমাজ?

রাজধানীর বুকে একের পর এক শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত কয়েক মাসে প্রাণঘাতী হাম কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য শিশুর প্রাণ। গত বছরের জুলাই মাসে মাইলস্টোন স্কুলের অন্তত ২৮ জন কিশোর-কিশোরীর অকাল মৃত্যুতে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল শহর। সেই সময় গণমাধ্যমগুলোতে কয়েক সপ্তাহব্যাপী চলেছে শোকের সংবাদ, হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়া সব স্থিরচিত্র আর টেলিভিশনের পর্দায় করুণ সুরের মূর্ছনা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় গণমাধ্যমের ‘মাইক্রোফোন’ সরে গেছে, ‘ক্যামেরা’ ঘুরেছে অন্য দিকে, আর জনমানুষের মনোযোগের বাতিও একসময় নিভে গেছে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যাঁদের কোল খালি হয়েছে বা যাঁদের জীবন সেই মুহূর্ত থেকে আমূল বদলে গেছে, তাঁদের মন থেকে কি শোক মুছে গেছে? সম্ভবত না। বরং এই মানুষগুলোর কাছে এক সময়ের চেনা শহরটা হঠাৎ করেই বিরাণ ও শূন্য হয়ে পড়ে। তাঁদের কাছে এটি তখন কেবলই এক ‘শোকের শহর’। এই শহরের প্রতিটি চেনা অলিগলি, রাস্তার বাঁক কিংবা আইসক্রিমের দোকান—সবই তখন দুর্বিষহ সব স্মৃতির উদ্রেক করে। কখনো সেই স্মৃতি অন্ধকারের মতো পেছন থেকে জাপটে ধরে, আবার কখনো অবাধ্য স্মৃতির দল একঝাঁক কাকের মতো তাঁদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এই অবর্ণনীয় যাতনা তাঁদের একাকী সইতে হয়, কারণ আমাদের সমাজে শোকাতুর মানুষকে মানসিক সহায়তা দেওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক চর্চা প্রায় নেই বললেই চলে।

১৯৬৯ সালে প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এলিজাবেথ কুবলার-রস তাঁর ‘অন ডেথ অ্যান্ড ডায়িং’ গ্রন্থে শোকের পাঁচটি মনস্তাত্ত্বিক স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, ‘অস্বীকৃতি’ (Denial), যেখানে মানুষ বিশ্বাসই করতে চায় না যে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, ‘ক্রোধ’ (Anger), যা কখনো নিজের ওপর, কখনো চিকিৎসকের ওপর বা কখনো সৃষ্টিকর্তার ওপর গিয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, ‘কি হতে পারত’ বা ‘বার্গেনিং’ (Bargaining), যেখানে মানুষ নানা কাল্পনিক সমীকরণ মেলাতে থাকে। চতুর্থ পর্যায়টি হলো ‘বিষণ্নতা’ (Depression) বা তীব্র অনাগ্রহ। আর সবশেষে আসে ‘স্বীকৃতি’ (Acceptance) বা কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া। এই স্তরগুলো যে ধারাবাহিকভাবে আসবে তা নয়, বরং যেকোনো স্তর বারবার ফিরে আসতে পারে।

একজন শোকাহত মানুষের প্রতি পরিবার, বন্ধু এবং সমাজের দায়িত্ব অত্যন্ত গভীর। প্রথমেই আমাদের মেনে নিতে হবে যে শোকযাত্রা সম্পন্ন করা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আমরা প্রায়ই শোককে ‘পাথরচাপা’ দিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাধ্য করি, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শোক কমে যায় না, বরং শোকযাত্রার সঠিক পরিক্রমা সম্পন্ন হলে আমরা শোকের সঙ্গেই বসবাস করতে শিখি। তাই স্বজনদের উচিত শোকাতুর ব্যক্তিকে তাঁর আবেগের বহিঃপ্রকাশ করার সুযোগ দেওয়া এবং তাঁর ক্ষোভ বা অনীহাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে বরং সহমর্মিতার সঙ্গে গ্রহণ করা।

ব্যক্তিগতভাবে শোকাতুর ব্যক্তিরা প্রার্থনা করা, ডায়েরি বা ‘জার্নাল’ লেখা কিংবা প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার মাধ্যমে নিজের ভেতরকার যন্ত্রণাকে একটি কাঠামো দিতে পারেন। বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর ‘মৌর্নিং অ্যান্ড মেলানকোলিয়া’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, শোককে যাপিত জীবনে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। অর্থাৎ শোকের আধিদৈবিক অস্তিত্বকে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় সংকট হলো আমাদের দেশে ‘গ্রিফ কাউন্সেলিং’ বা শোক পরামর্শের অভাব। সামাজিক লোকলজ্জার কারণে অনেকেই মনোবিদের কাছে যেতে চান না, পাছে তাঁকে ‘উন্মাদ’ ভাবা হয়। অথচ মনঃসমীক্ষণ অনুযায়ী, যে শোক ভাষা খুঁজে পায় না, তা পরে গভীর অপরাধবোধ বা শারীরিক অসুস্থতার রূপ নেয়। একটি মানবিক শহর হিসেবে আমাদের উচিত শোকাতুর মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ‘স্পেস’ বা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিচার বা উপদেশের চাপ ছাড়াই তারা মনের কথা বলতে পারবেন। আমাদের নাগরিকদের মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই পূর্ণাঙ্গ হবে না। এই শোকের শহরে শোকযাত্রার পথটি মসৃণ করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।