বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির জয়জয়কারের এই যুগে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) আরও শক্তিশালী করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশেষ উদ্যোগ 'প্যাক্স সিলিকা'-তে (Pax Silica) আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে নয়া দিল্লি। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) এই হাই-টেক জোটের সর্বশেষ সদস্য হিসেবে ভারত অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশগুলোর কাতারে শামিল হলো।
নয়া দিল্লিতে আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’-এর একটি বিশেষ অধিবেশনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের পক্ষে ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এস. কৃষ্ণান এই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। মূলত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগটি চালু করেছিল। এর প্রধান লক্ষ্য হলো এআই অবকাঠামোর জন্য অপরিহার্য সিলিকন-ভিত্তিক প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত রাখা এবং এআই খাতে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করা।
এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক জোরালো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে এই যোগদান একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কেবল ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে না। বরং এটি সুপরিকল্পিতভাবে এমন দেশগুলোর মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে, যারা স্বাধীনতা, পারস্পরিক অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিস্থাপকতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।’
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর এই পদক্ষেপকে ‘কৌশলগত এবং অপরিহার্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, প্যাক্স সিলিকা হচ্ছে এমন এক জোট যা একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শৃঙ্খলা নির্ধারণ করবে। তিনি আরও যোগ করেন যে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের খনি থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদনের কারখানা এবং এআই স্থাপনার ডেটা সেন্টার পর্যন্ত পুরো ‘সিলিকন স্ট্যাক’ সুরক্ষিত করাই এই জোটের মূল উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ভারত সরকার ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’ (IndiaAI Mission) চালু করে, যা দেশটিতে একটি শক্তিশালী এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পথে মাইলফলক। এবারের সামিটে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেটেরি অর্পো এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানসহ ২০ জন প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত ছিলেন, যা এই জোটের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুবিমল ভট্টাচার্যের মতে, এই জোটে যোগ দেওয়ার ফলে ভারত বৈশ্বিক এআই নীতি নির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা পালনের সুযোগ পাবে। এছাড়া তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের ডেপুটি ডিরেক্টর প্রণয় কোটাস্থানে উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বের চিপ ডিজাইন প্রতিভার প্রায় ২০ শতাংশই ভারতীয় প্রকৌশলী। প্রতি বছর ভারতে প্রায় ৩ হাজার নতুন চিপ ডিজাইন হচ্ছে। প্যাক্স সিলিকার সদস্যপদ ভারতকে কম্পিউট শক্তি, নতুন মডেল এবং বিশ্বস্ত বাজারের ইকোসিস্টেমে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। এর মাধ্যমে ভারত কেবল এআই প্রযুক্তির ভোক্তাই নয়, বরং অন্যতম প্রধান নীতি নির্ধারক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলো।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।