রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যের চারণভূমি পুরান ঢাকা। একসময় চৈত্র সংক্রান্তি এলেই তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার আর ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের দম ফেলার সময় থাকত না। দোকানের ধোয়া-মোছা, গদিতে নতুন গালিচা বিছানো আর মিষ্টির দোকানে আগাম অর্ডারের ধুম—সব মিলিয়ে এক এলাহি কাণ্ড। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সেই প্রাণের স্পন্দন যেন আজ স্থবির। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আধুনিক ডিজিটাল জীবনযাত্রা আর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার যৌথ প্রভাবে বাঙালির এই প্রাচীন ব্যবসায়িক উৎসব এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
স্বর্ণালংকারের জন্য প্রসিদ্ধ তাঁতীবাজারের গলিগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, রঙ-চঙের বদলে সেখানে কাজ চলছে কেবল দায়সারাভাবে। তাঁতীবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিমল ধর আক্ষেপের সুরে বলেন, “আগে বৈশাখের এক সপ্তাহ আগে থেকেই মহল্লায় উৎসব উৎসব ভাব থাকত। ক্রেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাম দিয়ে আসতাম। এখন ডিজিটাল যুগে মানুষ মোবাইলে টেক্সট পাঠাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এবার তো ঈদ গেল মাত্র কয়েকদিন আগে, মানুষের পকেটে টান আছে। তাই জৌলুস করে হালখাতা করার সাহস পাচ্ছি না।”
একই সুর শোনা গেল মানিকগঞ্জ জুয়েলার্সের মালিক সুভ্রত রায়ের কণ্ঠে। তাঁর মতে, পুরান ঢাকার নববর্ষ উদযাপনের সেই জৌলুস এখন মাত্র ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, “এর মূল কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং মানুষের মানসিক দুশ্চিন্তা। রুটি-রুজির অভাব আর ব্যবসায়িক দুরবস্থার কারণে উৎসবের সেই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ হারিয়ে গেছে। এখন আমরা কেবল নিয়ম রক্ষার খাতিরে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে দিনটি উদযাপন করি।”
মোগল সম্রাট আকবরের আমল থেকে কর আদায়ের সুবিধার্থে যে হালখাতার প্রচলন হয়েছিল, তা আজ আধুনিক ‘সফটওয়্যার’ আর ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং’-এর কাছে নতি স্বীকার করছে। হাতের লেখা খাতার চেয়ে ব্যবসায়ীরা এখন ‘মোবাইল অ্যাপ’ বা কম্পিউটারের ‘এক্সেল শিট’-এ হিসাব রাখাকেই নিরাপদ ও সহজ মনে করছেন। ফলে বকেয়া আদায়ের সেই সামাজিক মিলনমেলা আর প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না। শাঁখারীবাজারের ইউনিক গোল্ডের মালিক বিশ্বনাথ বলেন, “আগে যেখানে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ত সর্বস্তরের মানুষের মাঝে, এখন সেখানে টিকে থাকার লড়াইটাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়িক মন্দা আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরনো ঐতিহ্যের সেই জাঁকজমক আয়োজন আজ কেবল স্মৃতিতে টিকে আছে।”
ইসলামপুর ও বাংলাবাজারের পাইকারি বাজারের চিত্রও হতাশাজনক। ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন জানান, এবার আলোকসজ্জা বা কার্ড ছাপানোর কোনো তোড়জোড় নেই তাঁর দোকানে। সবকিছুর দাম বাড়তি হওয়ায় কেবল একটি নতুন খাতা কেনাই সার। বাংলাবাজারের সমরেশ রায় মনে করেন, এবারের ঈদ আর বৈশাখ কাছাকাছি হওয়ায় বাজার প্রায় ফাঁকা। পরিস্থিতি এমন যে, ঐতিহ্য এখন অনেক ব্যবসায়ীর কাছে একপ্রকার ‘বিলাসিতা’ ও ‘শৌখিনতা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুরান ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা আলতাফ হোসেনের মতো বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিতে আজও ভাসে ছোটবেলার সেই দিনগুলো, যখন হালখাতা মানেই ছিল নতুন জামা পরে মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডার হাতে বাড়ি ফেরা। তবে যান্ত্রিকতার এই ‘ডেডলাইন’ আর অর্থনৈতিক অস্থিরতা কি বাঙালির প্রাণের এই হালখাতাকে চিরতরে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেবে? এমন প্রশ্ন এখন সময়ের দাবি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।