বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও কার্যপরিধি গত কয়েক দশকে জ্যামিতিক হারে বাড়লেও, সেই তুলনায় বাড়েনি এর প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনবল। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ২১ হাজার ২৩২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক কাঠামো থাকলেও, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় চার হাজার কলেজের জন্য কোনো স্বতন্ত্র স্থানীয় কার্যালয় নেই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে গেলেও উচ্চশিক্ষার এই বিশাল অংশটি মাঠপর্যায়ে এক ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতার মধ্য দিয়ে চলছে, যা সামগ্রিক মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি, মৎস্য কিংবা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মতো প্রযুক্তিগত সেক্টরগুলোর জেলা-উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী উপস্থিতি থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষেত্রে এই কাঠামোগত অবহেলা দীর্ঘদিনের। এই সুযোগে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছে, যাঁদের সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন ‘প্রজেক্ট’ থেকে রাজস্ব খাতে আত্তীকরণ হওয়া ব্যক্তি বা কলেজের করণিক পদ থেকে উন্নীত কর্মকর্তারা অভিজ্ঞ অধ্যক্ষ ও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই নষ্ট করছে না, বরং এর ফলে ভুয়া সনদের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের মতো জালিয়াতিগুলো অগোচরেই থেকে যাচ্ছে।
প্রাথমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা করার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানেও প্রত্যাশিত সাফল্য অধরাই রয়ে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখন বেসরকারি খাতের দখলে। সরকারি স্কুলে বিনা বেতন, বিনা মূল্যে বই ও উপবৃত্তির মতো আকর্ষণীয় ‘বাজেট’ ও প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও অভিভাবকদের কিন্ডারগার্টেনের দিকে ঝুঁকে পড়া মূলত সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানের ওপর এক ধরনের অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা হওয়ার পরও আলিয়া ও কওমি—উভয় ধারাতেই আধুনিক ‘কারিকুলাম’ ও কারিগরি ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর ঘাটতি প্রকট।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বলছে, ১৮৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ডিরেক্টরেট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’ (ডিপিআই) ছিল একটি সমন্বিত কাঠামো। গত কয়েক দশকে এটি ভেঙে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা অধিদপ্তর করা হলেও তাতে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের জটিলতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে শিক্ষার মানে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে মাউশিকেও পুনরায় দ্বিখণ্ডিত করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তাঁদের মতে, এটি মূলত শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কণ্ঠরোধ করে অশিক্ষক বা জেনারেলিস্টদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রয়াস হতে পারে।
আধুনিক জননীতি বা ‘Public Policy’ অনুযায়ী, নীতি বাস্তবায়নের মূল প্রাণভোমরা হলেন ‘Street-level Bureaucrats’ বা শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের একাডেমিক প্রশাসকেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অধিদপ্তর ভাগ করা বা প্রশাসনিক স্তর বাড়ানোর চেয়ে পেশাগত দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা জরুরি। শিক্ষা যেহেতু একটি বিশেষায়িত জ্ঞাননির্ভর খাত, তাই এখানে তদারকি ও ব্যবস্থাপনার ভার অভিজ্ঞদের হাতে থাকাই শ্রেয়। এই কাঠামোগত সংস্কারের ওপরই নির্ভর করছে আগামীর ‘স্মার্ট’ বাংলাদেশ গড়ার কারিগরদের ভবিষ্যৎ।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।