মেয়ের শোকে কাঁদছেন বাবা, নাকি তিনি এক ‘ঠান্ডা মাথার খুনি’? সিনেমার গল্পকেও হার মানালো পারুল হত্যাকাণ্ড

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় সাত বছর আগে নিখোঁজ হওয়া তরুণী পারুল আক্তারের রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে এক রোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তথাকথিত আভিজাত্য ও পারিবারিক ‘সম্মান’ রক্ষার নামে নিজের সন্তানকে খুনের পর জামাতাকে ফাঁসাতে এক বাবা কীভাবে দীর্ঘ সাত বছর ধরে আইনের সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছেন, তা দেখে খোদ তদন্ত কর্মকর্তারাও হতবাক। এই নারকীয় ‘অনার কিলিং’ (Honor Killing) এর ঘটনাটি কোনো থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১২ সালে, যখন কালিহাতীর ঘড়িয়া পশ্চিমপাড়ার মো. কুদ্দুছ মিয়ার মেয়ে পারুল আক্তার পরিবারের অমতে পালিয়ে একই গ্রামের নাসির উদ্দিনকে (বাবু) বিয়ে করেন। এই বিয়েটি কুদ্দুছ মিয়া ও তাঁর পরিবার মেনে নিতে পারেননি; বরং একে সামাজিক অবমাননা হিসেবে দেখেন। বিয়ের পর তিন বছর এই দম্পতি আশুলিয়ায় বসবাস করলেও আয়ের সংকটে তাঁদের মধ্যে কলহ তৈরি হয়। এই সুযোগটি কাজে লাগান কুদ্দুছ মিয়া। তিনি মেয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই কৌশলে তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। এর তিন দিন পরই, অর্থাৎ ২২ জুলাই ভালো ছেলের সাথে পুনরায় বিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পারুলকে জয়পুরহাটের পাঁচবিবির একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান কুদ্দুছ ও তাঁর বন্ধু ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ ওরফে মোকা ডাকাত। সেখানে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে পারুলকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ তুলসীগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে নিজের অপরাধ আড়াল করতে এবং মেয়ের পছন্দের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে কুদ্দুছ মিয়া এক নজিরবিহীন নাটক শুরু করেন। তিনি জামাতা নাসিরের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের মামলা ঠুকে দেন। দীর্ঘ সাত বছর ধরে মামলাটি থানা-পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পিবিআই ও সিআইডি—এই চার সংস্থা তদন্ত করে কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। প্রতিটি সংস্থাই নিখোঁজের কোনো সুরাহা না পাওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিলেও কুদ্দুছ মিয়া বারবার ‘নারাজি’ আবেদন করেছেন। মামলা চালাতে গিয়ে তিনি জমিজমা বিক্রি করে ও ঋণগ্রস্ত হয়ে নিজেকে একজন নিরুপায় ও শোকাতুর পিতা হিসেবে জাহির করতে থাকেন।

তবে শেষ রক্ষা হয়নি। মামলাটি পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিশ্বজিৎ বিশ্বাস এবার নাসিরের করা একটি পুরনো জিডির (General Diary) সূত্র ধরে একটি ‘ক্লুলেস’ মুঠোফোন নম্বরের সন্ধান পান। সেই নম্বরটির কললিস্ট ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পারুল নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর বাবা ওই নম্বরটি ব্যবহার করতেন। যদিও পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘকাল এই নম্বরের কথা অস্বীকার করে আসছিলেন। পরবর্তীতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তির সহায়তায় পিবিআই নিশ্চিত হয় যে, ঘটনার রাতে কুদ্দুছ মিয়ার অবস্থান ছিল জয়পুরহাটের সেই হত্যাকাণ্ডেরস্থলে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পিবিআইয়ের জালে ধরা পড়েন কুদ্দুছ মিয়া। গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অকপটে নিজের মেয়ের জীবন নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, পালিয়ে বিয়ে করার ক্ষোভ থেকেই তিনি এই কাজ করেছেন এবং জামাতাকে সারা জীবন জেল খাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এদিকে, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানা থেকে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করা এক নারীর লাশের ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার মাধ্যমে পিবিআই নিশ্চিত করে যে, সেই লাশটিই ছিল দুর্ভাগা পারুলের। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই মামলার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে কুদ্দুছ মিয়া ও তাঁর সহযোগী ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ কারাগারে রয়েছেন এবং বগুড়ার আদালতে এই মামলার বিচারকার্য চলমান।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া