ক্রিকেটকে বলা হয় ‘ভদ্রলোকের খেলা’, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্লাব ক্রিকেটে সম্প্রতি যা ঘটেছে তাকে এককথায় ‘অবিশ্বাস্য জালিয়াতি’ বললেও কম বলা হবে। আম্পায়ারকে বোকা বানিয়ে ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে পাঠাতে মাঠের মধ্যেই এক নজিরবিহীন ও বিচিত্র প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা এক ফিল্ডার। বল যখন ব্যাটসম্যানের ব্যাটের খুব কাছ দিয়ে উইকেটকিপারের গ্লাভসে জমা হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আঙুল মটকানোর শব্দ করে বল ব্যাটে লেগেছে এমন বিভ্রান্তি তৈরি করেন ওই ফিল্ডার। আর সেই শব্দ শুনে বিভ্রান্ত হয়ে আম্পায়ারও আঙ্গুল তুলে আউটের সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন।
ঘটনাটি ঘটেছে ইংল্যান্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ার অ্যান্ড সাউথ ডারহাম লিগে, সল্টবার্ন ক্রিকেট ক্লাব ও মিডলসবরো ক্রিকেট ক্লাবের দ্বিতীয় একাদশের মধ্যকার একটি ম্যাচে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সল্টবার্ন ক্রিকেট ক্লাবের ওই স্লিপ ফিল্ডার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ব্যাটসম্যানের ব্যাটের পাশ দিয়ে বল যাওয়ার সময় আঙুল ফুটিয়ে শব্দ করেন। এই লিগের দ্বিতীয় ডিভিশনের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা সল্টবার্নের বিরুদ্ধে এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি প্রথম সামনে আনেন স্থানীয় ক্রিকেটার বেন মামেরি। তিনি ওই ভিডিও পোস্ট করে লেখেন, ‘বল ব্যাটের ধারেকাছে না থাকলেও প্রথম স্লিপের ফিল্ডার ব্যাটে লাগার আওয়াজ তৈরি করতে আঙুল মটকান। এটি ক্রিকেটের সবচেয়ে জঘন্য রূপ।’
এই ঘটনার রেশ ধরে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, সল্টবার্নের উইকেটকিপার সর্বশেষ ৮টি ম্যাচে একাই ৩১টি ক্যাচ নিয়েছেন! এমনকি এক ইনিংসেই তিনি ৮টি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেছেন, যা আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ক্যাচের (৭টি) বিশ্বরেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেছে। এই অস্বাভাবিক পরিসংখ্যান এখন সন্দেহের তীরে বিদ্ধ করছে পুরো সল্টবার্ন ক্লাবকে। মিডলসবরো দলের অধিনায়ক ররি কটেরিল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি নিজে ওই ম্যাচে নন-স্ট্রাইক প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই জালিয়াতি প্রত্যক্ষ করেছি। একই ম্যাচে অন্তত তিনবার এমন ঘটনা ঘটেছে এবং আমাদের দুই তরুণ ক্রিকেটার এর শিকার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমরা মাত্র ২৯ রানে ম্যাচটি হেরে যাই।’
বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট মহলে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সল্টবার্ন ক্রিকেট ক্লাব তাদের ওয়েবসাইটের লাইভ স্ট্রিম থেকে ভিডিও ফুটেজগুলো সরিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ততক্ষণে বিতর্কটি টকস্পোর্ট, বিবিসি ও স্কাই স্পোর্টসের মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর নজরে চলে এসেছে। এমনকি ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি পেসার জেমস অ্যান্ডারসনের ‘টেলএন্ডারস পডকাস্ট’-এও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
লিগ কর্তৃপক্ষ আজ এক দাপ্তরিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, গত শনিবারের সেই ম্যাচ নিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েছে এবং তাঁরা ইতিমধ্যেই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছেন। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই যুগে ‘স্মার্টফোন’ ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এই ধরণের জালিয়াতি ধরা পড়লেও, এটি ক্রিকেটের মৌলিক চেতনার ওপর এক বড় আঘাত। তদন্ত শেষে দোষী খেলোয়াড় ও ক্লাবের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ‘ডেডলাইন’ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আসে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।