ফুটবল বিশ্বের রাজকীয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ আরও একবার নিজেদের ‘ট্রান্সফার বাজেট’ নিয়ে বড় ধরনের চমক দিতে যাচ্ছে। এবার তাদের রাডারে ধরা পড়েছেন আইভরি কোস্টের ১৯ বছর বয়সী তরুণ প্রতিভা ইয়ান দিয়োমান্দে। যাকে ফুটবল বোদ্ধারা ‘নতুন মেসি’ হিসেবে তকমা দিলেও, এই তরুণের হৃদয়ে রাজত্ব করছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। লাইপজিগ থেকে প্রায় ১২ কোটি ইউরোর এক আকাশচুম্বী মূল্যে এই বিস্ময় বালককে দলে ভেড়ানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে লস ব্লাঙ্কোসরা। কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি বাকি থাকলেও, ফুটবল বিশ্বের নজর এখন এই আইভোরিয়ান উইঙ্গারের দিকে, যাঁর জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে এক রোমাঞ্চকর ও ট্র্যাজিক মহাকাব্য।
দিয়োমান্দের এই অবিশ্বাস্য যাত্রার শুরুটা হয়েছিল অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। শৈশবে তাঁর আবদার মেটাতে একটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি কিনে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি নিজ হাতে কালো মার্কার দিয়ে লিখেছিলেন ‘রোনালদো ৭’। অথচ তাঁর পায়ের জাদুকরী ড্রিবলিং দেখে লেগানেসের মালিক জেফ লুনাও তাঁকে ‘নতুন মেসি’ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। ইউটিউবের একটি সাধারণ ভিডিও থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা মাত্র কয়েক বছরেই ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। দুই উইংয়ে সমান দক্ষতা এবং দুই পায়েই নিখুঁত শট নেওয়ার ক্ষমতা দিয়োমান্দেকে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে কার্যকর ফুটবলারে পরিণত করেছে।
প্রাক্তন লেগানেস কোচ বোর্হা হিমেনেসের বয়ানে উঠে এসেছে দিয়োমান্দের রাজকীয় উত্থানের গল্প। ২০২৫ সালের মার্চে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে যখন তাঁর অভিষেক হয়, তখন কেউই ভাবতে পারেনি যে মাত্র কয়েক দিন আগে রিজার্ভ দলে যোগ দেওয়া এই কিশোর মাঠ কাঁপিয়ে দেবেন। সেই ম্যাচে রিয়ালের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে জার্সি বদল করেছিলেন তিনি, অথচ তাঁর প্রয়াত বোন রোকসান দাবি করতেন—দিয়োমান্দে এমবাপ্পের চেয়েও সেরা। বোনের এই অটল বিশ্বাসই আজ দিয়োমান্দের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে একটি পার্টিতে রহস্যজনকভাবে বিষক্রিয়ার শিকার হয়ে মারা যান রোকসান। সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেই আজ বিশ্বজয়ের নেশায় মত্ত এই ফুটবল নক্ষত্র।
ক্লাব ফুটবলে লাইপজিগের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়োমান্দেকে জাতীয় দলেও অপরিহার্য করে তোলে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইকুয়েডরের বিপক্ষে মাত্র ১৯ বছর ২১২ দিন বয়সে আইভরি কোস্টের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে রেকর্ড গড়েন তিনি। শুধু খেলাই নয়, কুরাসাওয়ের বিপক্ষে অ্যাসিস্ট করে গড়েন আরও একটি মাইলফলক। তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিখুঁত পাসিং দক্ষতা তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন তাঁর দাম সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ কোটি ইউরো হতে পারে, কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ ৬ গুণ বেশি অর্থ খরচ করে তাঁকে দলে নিয়ে প্রমাণ করেছে যে তাঁর সক্ষমতা প্রশ্নাতীত।
তবে এত খ্যাতি আর অর্থের জৌলুসেও পা মাটিতেই রেখেছেন দিয়োমান্দে। তাঁর জীবনবোধ অত্যন্ত পরিণত। শৈশবে ক্ষুধার জ্বালায় আলু চুরি করে খাওয়া সেই দিনগুলোর কথা তিনি আজও ভোলেননি। ‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’-এ এক খোলা চিঠিতে তিনি লিখেছেন যে টাকার মোহে তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চান না। লেগানেসে থাকাকালীন নিজের আয়ের সবটুকুই বাড়িতে পাঠাতেন এবং নিজে থাকতেন ফুটবল একাডেমির একটি ছোট ঘরে, যেখানে ছিল না কোনো টেলিভিশন। দিয়োমান্দে মনে করেন, টাকাপয়সা মানুষকে বদলে দেয়, এমনকি কাছের মানুষদেরও। তাই তাঁর কাছে ফুটবল আর ঘুমই ছিল একমাত্র আরাধনা। রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে এমন এক লড়াকু ও বিনয়ী যোদ্ধার অন্তর্ভুক্তি কেবল দলের শক্তিই বাড়াবে না, বরং ফুটবলের এক মানবিক দিককেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।