বন্ডে ৫৭ হাজার কোটির দেনা: মহাবিপদ এড়াতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের জরুরি দাওয়াই

 সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় তীব্র চাপের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বন্ডের দেনা বাবদ পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার, দেশীয় মুদ্রায় যার অঙ্ক দাঁড়ায় ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া এবং অর্থনীতির পুনঃ অর্থায়নঝুঁকি কমাতে মেয়াদপূর্তির আগেই বাজার থেকে নির্দিষ্ট কিছু বন্ড কিনে নেওয়ার (বাই-ব্যাক) জোর সুপারিশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক। প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে বন্ড পুনঃক্রয়ের এই কার্যক্রম শুরু করে পরবর্তীতে তা স্থায়ী কাঠামোতে রূপ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা দুটি।


আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতিগত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একসঙ্গে অনেক বন্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার চাপ সামলানো এবং বাজারে ছড়িয়ে থাকা ২৩৭টি ছোট-বড় বন্ডের খণ্ডিত ব্যবস্থাকে গুটিয়ে এনে কমসংখ্যক বড় বেঞ্চমার্ক বন্ডে রূপান্তর করা জরুরি। এতে সরকারের ঋণ পরিশোধের দায় যেমন বণ্টন হবে, তেমনি গতিহীন সেকেন্ডারি বন্ড বাজারও চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ‘দায় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম: স্থানীয় মুদ্রার বন্ড বাজারের উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি কারিগরি সহায়তা প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে সংস্থা দুটির একটি যৌথ প্রতিনিধিদল। এই মিশনের নেতৃত্বে ছিলেন আইএমএফের অরিন্দম রায় এবং বিশ্বব্যাংকের জসোল্ট বাঙ্গো।


প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একই সময়ে বিপুল বন্ডের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে সরকারের ওপর চরম পুনঃ অর্থায়নঝুঁকি চেপে বসছে। অর্থাৎ, পুরোনো পুঞ্জীভূত ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারকে নতুন করে ফের বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক বোঝাকে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে দিচ্ছে।


এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে সতর্ক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেখতে হবে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের এসব পরামর্শকে সরকার কীভাবে নিচ্ছে। সরকার রাজি না হলে তো পরামর্শ কাগজেই পড়ে থাকবে। কত টাকার বন্ডের পুনঃক্রয় লাগবে, আর এ জন্য সংস্থা দুটি কোনো অর্থায়ন করবে কি না, তা-ও আলোচনাযোগ্য। কারণ, পুনঃক্রয় করতেও টাকা লাগবে।’


পরিসংখ্যান বলছে, সরকারের মোট বন্ডের প্রায় ১২ শতাংশেরই মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে। এই ৫০০ কোটি ডলারের বিশাল বোঝা এক ধাক্কায় কোষাগার থেকে মেটাতে গেলে নতুন ঋণের তীব্র চাপ তৈরি হবে। এ পরিস্থিতি এড়াতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ডের একটি বড় অংশ বাজার থেকে পুনঃক্রয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো বন্ড তুলে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নতুন বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নিলে দায়ের ভার একটি নির্দিষ্ট সময়ে না এসে বছরজুড়ে সুষমভাবে ছড়িয়ে পড়বে।


বন্ড পুনঃক্রয়ের এই প্রক্রিয়াটি মূলত পরিচালিত হয় প্রতিযোগিতামূলক ‘রিভার্স অকশন’ বা উল্টো নিলামের মাধ্যমে। প্রচলিত নিলামে সরকার বিনিয়োগকারীদের কাছে সিকিউরিটিজ বিক্রি করে থাকলেও, উল্টো নিলামের নিয়মানুযায়ী বিনিয়োগকারীরা সরকারের কাছে তাঁদের হাতে থাকা বন্ড বিক্রির আনুষ্ঠানিক দরপ্রস্তাব দেবেন এবং সরকার সুবিধাজনক মূল্যে তা কিনে নেবে।


এদিকে দেশের বন্ড বাজারের গঠনগত ত্রুটিও সামনে এনেছে সংস্থা দুটি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সরকারের চালু বন্ডের সংখ্যা ছিল ২৩৭টি। যেখানে প্রতিটি বন্ডের গড় আকার মাত্র ১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, অথচ একটি আদর্শ বেঞ্চমার্ক বন্ডের লক্ষ্যমাত্রা অন্তত ৯ হাজার কোটি টাকা হওয়া প্রয়োজন। মাত্রাতিরিক্ত ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বন্ডের কারণে বাজার মারাত্মকভাবে খণ্ডিত হয়েছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে লেনদেনে। ২০২২ অর্থবছরে যেখানে বন্ডের সরাসরি লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪ অর্থবছরে তা আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হয়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নেমে আসে।


এই জড়তা কাটাতে আগামী ৫ বছরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ১২০টি বন্ডের বিপরীতে বিভিন্ন মেয়াদের মাত্র ১০ থেকে ১৫টি শক্তিশালী বড় বন্ড চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সরকারি বন্ডের বড় অংশের ধারক মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলো প্রায়শই এসব বন্ডকে মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত ধরে রাখার নীতি (হোল্ড-টু-ম্যাচুরিটি) অনুসরণ করে। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাজারে বিক্রি করতে গেলে আর্থিক বিবরণীতে লোকসান দেখানোর ঝুঁকি থাকে। এ কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই পুনঃক্রয় প্রক্রিয়ায় যুক্ত না করার পরামর্শ এসেছে।


সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সরকারের দুর্বল নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা বা ক্যাশ বাফার। হাতে প্রয়োজনীয় আপৎকালীন তহবিল না রেখে শেষ মুহূর্তে অর্থ জোগাড় করতে গেলে সরকারের ওপর চরম আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এমনকি বাজারে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের বার্তা ছড়িয়ে পড়লে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার অস্থিতিশীলভাবে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ কারণে মেয়াদোত্তীর্ণের চূড়ান্ত মুহূর্তের অপেক্ষায় না থেকে অনেক আগে থেকেই সুশৃঙ্খল অর্থ সংস্থানের পূর্বপ্রস্তুতি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক।