পেনশন কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তন, ৫ বছর পর অর্থ তোলার সুযোগ

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও আকর্ষণীয় করতে একাধিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়া এবং ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন চালুর প্রস্তাব।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এটি কর্তৃপক্ষের চতুর্থ পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক। সভায় মোট ১১টি আলোচ্যসূচি রাখা হয়েছে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পর্ষদে যেসব প্রস্তাব অনুমোদন পাবে, পরবর্তী সময়ে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির আওতায় প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে। কর্মজীবী, অনিয়মিত আয়ের মানুষ এবং প্রবাসীদের পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্যেই এসব স্কিম চালু করা হয়েছে।

দেশের চার শ্রেণির প্রায় ১০ কোটি মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চালুর তিন বছর পর চারটি স্কিমে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছেন ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন। তাদের জমা করা মোট আমানতের পরিমাণ ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সমতা স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন। এ স্কিমে জমা হয়েছে ৫৬ কোটি ৮৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রবাসীদের জন্য চালু করা প্রবাস স্কিমে সাড়া তুলনামূলক কম। এ পর্যন্ত এতে ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী ৯৭ জন। এ স্কিমে মোট জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

গ্রাহকদের অনেকে মনে করছেন, ব্যাংকে আমানত রাখার তুলনায় রিটার্ন কম এবং পেনশন পাওয়ার আগে তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধার সুযোগ সীমিত থাকায় কর্মসূচিটির প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রত্যাশার তুলনায় কম।

পাঁচ বছর পর অর্থ উত্তোলনের প্রস্তাব

বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো স্কিমে যুক্ত হওয়ার পর মাঝপথে বের হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে কোনো গ্রাহক নিয়মিত চাঁদা দিতে না পারলে জমা অর্থ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ নিয়ম পরিবর্তনের দাবি দীর্ঘদিনের।

নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক পাঁচ বছর অর্থ জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে চাঁদা চালিয়ে যেতে অক্ষম হলে বিশেষ বিবেচনায় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

নমিনির জন্য আজীবন পেনশন

পেনশনভোগী মারা গেলে তার মনোনীত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। বর্তমানে চাঁদাদাতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আজীবন পেনশন পান। তিনি মারা গেলে পরিবারের অন্য কেউ সাধারণভাবে পেনশন সুবিধা পান না।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, চাঁদাদাতা ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তার নমিনি ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত যে সময় বাকি থাকে, শুধু সেই সময়ের জন্য পেনশন পান। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

৫৫ বছর বয়সেই পেনশন

বর্তমানে ৬০ বছর বয়সে পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে পেনশন পাওয়ার বয়স ৫৫ বছর করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ের চাঁদা পূরণকারী গ্রাহকেরা আগের তুলনায় পাঁচ বছর আগেই পেনশন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন।

এর আগে গত বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের দ্বিতীয় পর্ষদ বৈঠকে ৬০ বছর বয়সে পৌঁছালে চাঁদাদাতাদের জমা করা অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তার আগে এককালীন অর্থ উত্তোলনের সুযোগ ছিল না।

ইসলামি পেনশন স্কিম চালুর উদ্যোগ

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে ইসলামি সংস্করণ চালুর বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের কথা বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের স্কিম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিমা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে ১০ থেকে ২০ টাকার মতো প্রিমিয়াম নিয়ে বিমা সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

নিবন্ধন কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব

পেনশন কর্মসূচিতে গ্রাহক নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক, ডাক বিভাগ, মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ (এমএফএস) অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে নিবন্ধনের জন্য কমিশন ১৫ টাকা। এটি বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সর্বজনীন পেনশন স্কিমে গ্রাহকদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তহবিল

দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি এবং মুনাফার হার পরিবর্তনের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় রিজার্ভ বা কনটিনজেন্সি তহবিল গঠনের প্রস্তাবও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদে পেনশন তহবিলের আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এ ধরনের তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রস্তাবগুলো পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ যেসব প্রস্তাব অনুমোদন করবে, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যেভাবে নিবন্ধন করবেন

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে ইউপেনশন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের শুরুতে আবেদনকারীর সামনে একটি প্রত্যয়ন পাতা আসবে। সেখানে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত না থাকা এবং সরকারি বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কোনো সুবিধা না নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিতে হবে।

‘আমি সম্মত আছি’ অপশনে ক্লিক করার পর পরবর্তী ধাপে গিয়ে প্রবাস, সমতা, সুরক্ষা বা প্রগতি এই চারটি স্কিমের মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে। এরপর এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ, মুঠোফোন নম্বর ও ই-মেইল আইডি দিতে হবে।

পরবর্তী ধাপে ক্যাপচা পূরণ করার পর আবেদনকারীর মুঠোফোন নম্বর ও ই-মেইলে একটি ওটিপি বা একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন নম্বর পাঠানো হবে। নির্ধারিত ঘরে ওই ওটিপি দিয়ে পরবর্তী ধাপে গেলেই নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যাবে।

নতুন প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে গ্রাহকদের জন্য অর্থ উত্তোলন, পেনশন পাওয়ার বয়স, নমিনি সুবিধা, স্বাস্থ্য বিমা এবং ইসলামি স্কিমসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।