উচ্চ করের বোঝা এবং ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক নীতিতে অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাজ্য ছাড়ছেন দেশটির ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ। একই সময়ে তাঁদের আকৃষ্ট করতে করসুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ দিচ্ছে গ্রিস, ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ। ফলে ধনী ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের করনীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সর্বশেষ যুক্তরাজ্য ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশটির ধনকুবের ক্রিস রোকোস। হেজ ফান্ড রোকোস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা তিনি এবং যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষ করদাতা হিসেবে পরিচিত। দাতব্যকাজে দানধ্যানের জন্যও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। তবে এবার যুক্তরাজ্য ছেড়ে গ্রিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
রোকোসের এই সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ সরকারের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটিতে গত কয়েক বছর ধরে ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের ওপর করের চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যবসা ও রাজনৈতিক নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন ধনী ব্যক্তি ও তাঁদের পরামর্শকেরা।
গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে ধনী ব্যক্তিদের করব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি বড় পরিবর্তন এসেছে। বিদেশে স্থায়ী আবাস থাকা ব্যক্তিদের জন্য চালু থাকা বিশেষ করসুবিধা বা ‘নন-ডম’ ব্যবস্থা ২০২৪ সালের মার্চে বাতিল করা হয়। এর পাশাপাশি এই ব্যবস্থার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের ওপরও করের চাপ বাড়ানো হয়েছে।
শুধু নন-ডম ব্যবস্থাই নয়, গত দুই বছরে উত্তরাধিকার, পেনশন তহবিল, প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগের মুনাফা, নিয়োগকর্তার জাতীয় বিমা চাঁদা এবং মূলধনি মুনাফার ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ওপর উইন্ডফল ট্যাক্স আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি। ফলে ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে ভবিষ্যতে করভার আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিডিওর ব্যক্তিগত করবিষয়ক অংশীদার এলসা লিটলউড বলেন, তাঁদের অনেক গ্রাহক মনে করছেন, যুক্তরাজ্যের করব্যবস্থায় এত বেশি পরিবর্তন এসেছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের এখন প্রধান চাওয়া করব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা।
তবে যুক্তরাজ্য থেকে ঠিক কতজন ধনী ব্যক্তি দেশ ছাড়ছেন, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া কঠিন। ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব বিভাগ এইচএম রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমসের (এইচএমআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ করবর্ষে নন-ডম করদাতার সংখ্যা ছিল ৭৩ হাজার ৪০০। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা প্রায় ৪০০ জন কমেছে।
তবে বেসরকারি ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং কর পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস্তবে যুক্তরাজ্য ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে। বিশেষ করে অতিধনী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে করের পাশাপাশি সম্পদ হস্তান্তর ও ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় আসছে।
অতিধনী ব্যক্তিদের অন্যতম বড় উদ্বেগ এখন যুক্তরাজ্যের উত্তরাধিকার কর। নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদের ওপর এই করের হার ৪০ শতাংশ। নতুন নিয়মে বিদেশে থাকা সম্পদও যুক্তরাজ্যের উত্তরাধিকার করের আওতায় এসেছে। ফলে বিদেশে সম্পদ থাকা ধনী ব্যক্তিদের ওপর ভবিষ্যৎ করের চাপ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এক আন্তর্জাতিক প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী বলেন, তাঁর পরিচিত অনেক ব্যক্তি যুক্তরাজ্য ছেড়ে গেছেন। তাঁদের বেশির ভাগের বক্তব্য, বিদেশি সম্পদের ওপর উত্তরাধিকার কর তুলে দেওয়া হলে তাঁরা যুক্তরাজ্যে ফিরে আসবেন।
ব্যবসায়িক সম্পদের ক্ষেত্রেও উত্তরাধিকার করের ছাড় কমানো হয়েছে। নতুন নিয়মে ১০ লাখ পাউন্ডের বেশি মূল্যের ব্যবসায়িক সম্পদের ওপর ২০ শতাংশ হারে উত্তরাধিকার কর দিতে হবে। এর ফলে বিশেষ করে পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যবসাগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে।
আইনি প্রতিষ্ঠান উইদার্সের অংশীদার ক্রিস গ্রোভস বলেন, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে যদি হঠাৎ তার মোট মূল্যের ২০ শতাংশ নগদ অর্থে পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেটি প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। করব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে অনেক ব্যবসায়ী আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে তাঁদের উত্তরসূরিদের কর পরিশোধের অর্থ জোগাড় করতে ব্যবসার অংশবিশেষ, এমনকি পুরো ব্যবসাই বিক্রি করে দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি বলেছেন, যুক্তরাজ্য হবে ‘সম্পদ সৃষ্টির দেশ’। পুরোনো নন-ডম ব্যবস্থা বাতিলের পর নতুন করব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর আওতায় যোগ্য নতুন করদাতারা প্রথম চার বছর বিদেশি আয় ও মুনাফার ওপর পুরো করছাড় পাবেন।
তবে কর পরামর্শকেরা মনে করছেন, ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে চার বছরের সুবিধা যথেষ্ট নয়। তাঁদের কেউ কেউ এই সুবিধার মেয়াদ ১০ বছর করার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইতালি ও গ্রিসের মতো নির্দিষ্ট হারে করব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও এসেছে।
কর পরামর্শকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি করনিশ্চয়তা এবং তুলনামূলক সুবিধাজনক কাঠামো থাকলে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাজ্যে ধরে রাখা কিংবা নতুন করে আকৃষ্ট করা সহজ হতে পারে। ফলে একদিকে ধনীদের দেশত্যাগ ঠেকানো এবং অন্যদিকে রাজস্ব আদায় এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন ব্রিটিশ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।