শিক্ষার খোলনলচে বদলে দিতে ১২ দফা মহাকর্মযজ্ঞ: খাদের কিনার থেকে জাতিকে ফেরানোর কারিগর কি ববি-মিলন জুটি?

শিক্ষার খোলনলচে বদলে দিতে ১২ দফা মহাকর্মযজ্ঞ: খাদের কিনার থেকে জাতিকে ফেরানোর কারিগর কি ববি-মিলন জুটি?

দেশের শিক্ষা খাতকে ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুদ্ধার করে একটি আধুনিক, বৈশ্বিক ও কর্মমুখী কাঠামোয় রূপান্তর করতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জাতির সামনে ১২ দফার একটি যুগান্তকারী ‘সংস্কার এজেন্ডা’ উপস্থাপন করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ভিশন’ ও নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঘোষিত এই পরিকল্পনায় শিক্ষাকে কেবল ‘খরচের খাত’ নয়, বরং একটি ‘মানবসম্পদ তৈরির কারখানা’ ও জাতি গঠনের প্রধান প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ১২ দফা এজেন্ডার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো—বাজেটের ‘এনভেলপ’ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। ছাত্রছাত্রীদের পুষ্টির কথা মাথায় রেখে ‘মিড-ডে মিল’ ব্যবস্থা চালু, আধুনিক স্যানিটেশন ও ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটাতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে শিক্ষকদের ডিজিটাল পাঠ-পরিকল্পনা ও ‘লার্নিং অ্যাভিডেন্স ট্র্যাকিং সিস্টেম’ চালু করা হবে। এছাড়া বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আরবি, চীনা, জাপানি বা ফরাসি ভাষাকে ‘তৃতীয় ভাষা’ হিসেবে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে উদ্ভাবনী মানসিকতা তৈরিতে প্রতিটি উপজেলায় ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’ স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ‘স্পোর্টস পিরিয়ড’ অন্তর্ভুক্ত করার মতো আধুনিক পরিকল্পনাও এতে রয়েছে।

তবে এই বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা কিছুটা সতর্কবার্তা ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, শিক্ষা খাতের পরিবর্তন টেকসই করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত সামাজিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে গতানুগতিক প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন ‘বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স’ গঠন করা জরুরি, যারা সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত সুপারিশ দেবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।”

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. এম জসিম উদ্দিন মনে করেন, উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “সবার জন্য পিএইচডি বা অনার্স বাধ্যতামূলক নয়। আমরা যদি আইটি (IT), ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিক্যাল ট্রেডে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারি, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের শ্রমশক্তির চাহিদা বাড়বে এবং দেশের ‘রেমিট্যান্স’ প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।” এছাড়া বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি দূর করে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের সংস্কার তালিকায় আরও রয়েছে—পরীক্ষা পদ্ধতিতে মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে ‘আইটেম ব্যাংক’ ও ‘লার্নিং ট্রাজেক্টরি’র মাধ্যমে প্রকৃত মেধা পরিমাপ করা। সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করা এবং এক ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার সুযোগ হিসেবে ‘স্কিল ক্রেডিট’ বা ব্রিজ কোর্স চালু করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘জ্ঞান প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তরের লক্ষ্যে স্টুডেন্ট লোন ও ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ প্রদানের ঘোষণাও এসেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একটি মাসিক ‘পাবলিক ড্যাশবোর্ড’ চালু করা হবে, যেখানে নাগরিকরা প্রকল্পের অগ্রগতি ও ক্লাসঘণ্টার হিসাব সরাসরি তদারকি করতে পারবেন। শিক্ষা খাতের এই মহাপরিকল্পনা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।