আইন ও বিচারের হাত থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালিয়েও শেষ রক্ষা হলো না এক সময়ের প্রতাপশালী পুলিশ কর্মকর্তা ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ও পরে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা পাহাড়সম দুর্নীতির পাহাড় এখন তাঁকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর অপেক্ষায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে। রোববার (১৪ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার আইনি রূপরেখা স্পষ্ট করা হয়েছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট ছয়টি গুরুতর মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় ইতিমধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং অপর একটির বিচারিক কার্যক্রম চলমান। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, সরকারি পদে থাকাকালীন বেনজীর আহমেদ তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রায় ৭৬ কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। শুধু তাই নয়, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে একাধিক ব্যক্তিগত পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন, যা পাসপোর্ট অর্ডারের সরাসরি লঙ্ঘন।
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, গত ১২ জুন এনসিবি আবুধাবির মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফেডারেল ল নম্বর ৩৯ (২০০৬)’ অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক ‘এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট’ বা প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠাতে হবে। যদি এই নির্ধারিত ‘ডেডলাইন’-এর মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও নিশ্চিত করেছেন যে, পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা বর্তমানে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ও পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সমন্বয় করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যর্পণ প্রস্তাবটি অনুমোদন করে কূটনৈতিক চ্যানেলে আবুধাবির কাছে পাঠাবে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭ এবং ৪৬৮ ধারার পাশাপাশি ১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট অর্ডারের ১১ ধারায় মামলাগুলো সক্রিয় রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আইজিপির দায়িত্ব পালন করা বেনজীর আহমেদ এর আগে ডিএমপি কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তাঁর নাম আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন। দুবাইয়ে তাঁর এই আটকের ঘটনা বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা। এখন দেখার বিষয়, আইনি সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কত দ্রুত তাঁকে ঢাকার মাটিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।