‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’: সুর, ছন্দ আর কবিতায় ১৪৩৩-এর বর্ষাবরণ

মেঘমেদুর আকাশ আর রিমিঝিম বৃষ্টির ছন্দে শুরু হলো বাঙালির প্রিয় ঋতু বর্ষা। কদম-কেতকীর সুবাস আর প্রকৃতির সজল রূপকে বরণ করে নিতে রাজধানী ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গন সেজেছিল এক অনন্য সাজে। ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’—এই চিরায়ত স্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করে বাংলা একাডেমির ঐতিহাসিক নজরুল মঞ্চে ‘বর্ষা উৎসব ১৪৩৩’ উদযাপন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সোমবার (১৫ জুন) আষাঢ়ের প্রথম সকালে ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় সংগীত, নৃত্য ও কবিতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন প্রত্যক্ষ করেছে নগরবাসী।

উৎসবের পর্দা ওঠে শাস্ত্রীয় সংগীতের শুদ্ধতম মূর্ছনায়। ওস্তাদ জাবীর ইমাম খান শাহী তাঁর সেতারে মেঘের সুর ‘মিয়া কি মল্লার’ রাগ পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শকদের এক অপার্থিব অনুভূতির জগতে নিয়ে যান। রাগ সংগীতের এই গম্ভীর ও স্নিগ্ধ সুর যেন আষাঢ়ের ঘনঘটাকেই মূর্ত করে তুলেছিল নজরুল মঞ্চে। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মূল পর্ব, যেখানে উদীচীর কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের পাশাপাশি সংগঠনের উত্তরা ও ডেমরা শাখার শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে বর্ষার গান পরিবেশন করেন।

একক সংগীতের আসরে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী অনিমা রায়, আবদুল ওয়াদুদ এবং রুদ্র দাশ। বাংলার লোকজ সুরের আমেজ ছড়িয়ে দিতে মঞ্চে আসেন বিমান বিশ্বাস, মায়েশা সুলতানা উর্বি, মীর সাখাওয়াত, হুমায়রা তাসিন, অদ্বয় স্যান্যাল আর্য এবং জাকির হোসেন। তাঁদের দরাজ কণ্ঠের মেঠো গানগুলো যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততাকে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। নাচের ছন্দে বৃষ্টির দোলা ছড়িয়ে দেয় ‘বহর’ ও ‘স্পন্দন’ নৃত্যদলের শিল্পীরা। কবিতার আবৃত্তিতে বর্ষার বিরহ ও রোমান্টিকতা তুলে ধরেন একরাম হোসেন ও সজীব তানভীর।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনার বাইরে আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘বর্ষা কথন ও আলোচনা’ সভা। এই পর্বে বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বর্ষার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন বরেণ্য লেখক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা। উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন তাঁদের বক্তব্যে বলেন, নগরায়নের চাপে মানুষ আজ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি মানুষকে পুনরায় মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং ঋতুচক্রের সাথে তাঁদের আত্মার সংযোগ ঘটানো।

পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন মৌমিতা জান্নাত, সজীব তানভীর ও রুমি দে। উৎসবের সফল সমাপ্তি শেষে উদীচী কর্তৃপক্ষ অংশগ্রহণকারী সকল শিল্পী, গুণী অতিথি এবং সংবাদকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল ভুলে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় অবগাহন করতে পেরে খুশি উৎসবে আসা সাধারণ দর্শকরাও।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।