আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য এক অভাবনীয় ও বিশাল সাফল্যের বার্তা এসেছে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে। ১৯৫৯ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) নির্বাহী কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই দীর্ঘ ৬৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এর ব্যুরোর সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেছে বাংলাদেশ। জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয় ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান আনুষ্ঠানিকভাবে এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
ইউএনএইচসিআরের এই চার সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটির ব্যুরো অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি কাঠামো, যা মূলত সংস্থাটির সার্বিক কার্যক্রমে নীতিনির্ধারণী দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি শরণার্থী এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যা সমাধানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করাই এই ব্যুরোর প্রধান কাজ। এই নেতৃত্বের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, মানবিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ও ত্যাগের ওপর বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর আস্থা রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহানের এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সর্বসম্মত। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পরামর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একক আঞ্চলিক প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়। পরবর্তীতে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রার্থিতা সমর্থন করলে নির্বাহী কমিটির ১১০টি সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশের নেতৃত্বে সায় দেয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নিরঙ্কুশ সমর্থন বাংলাদেশের দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রনীতির এক বড় বিজয়।
রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান একজন পেশাদার ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক। এর আগে তিনি জর্ডানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রোম ও কলকাতাতেও তিনি বাংলাদেশের মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক থাকাকালে তিনি ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। তিনি ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক’ (এফডিএমএন) বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য-সচিব হিসেবেও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ যখন প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তখন ইউএনএইচসিআরের এই শীর্ষ পদের দায়িত্ব গ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের দাবিতে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা তহবিলের সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের এই নতুন অবস্থান একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বব্যাপী যখন বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চরম অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই নেতৃত্ব ‘রেসপনসিবিলিটি শেয়ারিং’ বা দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে। এই অর্জন কেবল একটি পদের প্রাপ্তি নয়, বরং এটি বিশ্ব শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন অঙ্গীকারের এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।