যুক্তরাষ্ট্রের ‘চায়না-শক’ কি নিছক এক জনশ্রুতি? বেরিয়ে এল নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দেশ মিডিয়া: বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও শিল্পায়নে চীনের প্রভাব। মার্কিন জনপরিসরে একটি প্রচলিত ধারণা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত যে, এক শক্তিশালী অভিজাত গোষ্ঠীর একক সিদ্ধান্তে বেইজিংয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার উন্মুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে দেশটির উৎপাদনশিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে এবং লাখ লাখ মানুষ কাজ হারান। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান—উভয় শিবিরের রাজনীতিবিদ এবং মূলধারার গণমাধ্যম এই ‘চায়না-শক’ তত্ত্বকে জোরালোভাবে সমর্থন করলেও, নিবিড় অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এর ভিন্ন এক রূপ ফুটে উঠেছে।

২০০০ সালে চীনের সঙ্গে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক (PNTR) এবং ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) বেইজিংয়ের অন্তর্ভুক্তির পর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অভাবনীয় গতিতে বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটর, ডেভিড ডর্ন ও গর্ডন হ্যানসনের গবেষণায় দাবি করা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে চীনা আমদানির প্রবল প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে নিট ১৫ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু ও ব্রেন্ডান প্রাইসকে সঙ্গে নিয়ে করা এক হালনাগাদ গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৪ লাখে।

তবে এই বিশাল সংখ্যাটি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা জরুরি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে প্রতি মাসে গড়ে ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক চাকরি বদলাতেন বা কাজ হারাতেন। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার জনই ছিলেন উৎপাদন খাতের। অর্থাৎ, শ্রমবাজারের স্বাভাবিক পরিবর্তনের তুলনায় চীনা আমদানির প্রভাব ছিল সীমিত।

২০১৯ সালে অর্থনীতিবিদ রবার্ট ফিনস্ট্রা ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় বাণিজ্যের অন্য দিকটি উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, ১৯৯১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে চীনের আমদানির কারণে ১৯ লাখ চাকরি কমলেও, একই সময়ে রপ্তানি (Export) বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সমপরিমাণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ফলে শুধু একতরফা ক্ষতি হয়নি, বরং অর্থনীতির নতুন নতুন খাত চাঙ্গা হয়েছে।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, মার্কিন উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থান কমার প্রবণতা ১৯৫০-এর দশক থেকেই শুরু হয়েছিল। ২০০১ সালে চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের অনেক আগেই শিল্পায়নের গতি প্রকৃতি পাল্টাতে থাকে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পতনের প্রধান কারণ সস্তা আমদানি নয়, বরং আধুনিক উৎপাদনশীলতা বা প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার (Automation) উন্নয়ন।

অনেকে মনে করেন, চীনকে বাণিজ্যের সুযোগ দেওয়া ছিল একটি আকস্মিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১৯৮০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর চীনের বাণিজ্য সুবিধা নবায়ন করে আসছিল। ১৯৮৯ সালে মার্কিন আমদানিতে চীনা পণ্যের অংশ ছিল মাত্র ২.৫ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালে বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়ায় এবং ২০০৭ সালে তা ১৬.৪ শতাংশে পৌঁছায়। এটি কোনো একক গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত নয়, বরং লাখো মার্কিন ভোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত চাহিদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া ছিল।

এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের উচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মতো নতুন প্রযুক্তির প্রভাবে সম্ভাব্য পরিবর্তনের কথা ভাবা। অর্থনীতিতে প্রযুক্তির ধাক্কা লাগলে কোনো দেয়াল তুলে তা আটকানো সম্ভব নয়; বরং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি ভর্তুকি বা সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উদারতা ও গতিশীলতাই দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি, ভয় নিয়ে একে প্রতিহত করা কোনো টেকসই সমাধান নয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।