নরওয়ের আধুনিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, দেশটির দীর্ঘদিনের সংস্কারমুখী রাষ্ট্রপ্রধান রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ড পরলোকগমন করেছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে অসলো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। নরওয়ের রাজপ্রাসাদ আনুষ্ঠানিকভাবে এক বিবৃতির মাধ্যমে তাঁর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইউরোপের সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ ক্ষমতাসীন এই সম্রাটের বিদায়ে নরওয়েজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের আবহ।
বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি রক্তে ব্যাকটেরিয়াজনিত গুরুতর সংক্রমণের কারণে চলতি মাসের ১৭ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় ব্যক্তিগত ছুটিতে অবস্থানকালে মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হলে তাঁকে সেখানে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সে সময় তাঁর হৃদযন্ত্র সচল রাখতে একটি অস্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে নিজ দেশে ফেরার পর চিকিৎসকেরা স্থায়ী পেসমেকার প্রতিস্থাপন করেন। দীর্ঘকাল ধরেই তিনি অসুস্থতার সাথে লড়াই করছিলেন, তবে ২০২৪ সালে শারীরিক দুর্বলতার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নিজের উপস্থিতি কিছুটা কমিয়ে আনলেও সিংহাসন ত্যাগের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ছিল—রাজা হিসেবে প্রজাদের দেওয়া সেবার শপথ আজীবনের।
ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার প্রপৌত্র পঞ্চম হ্যারাল্ড ১৯৩৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন। দীর্ঘ প্রায় ৫৭০ বছরের ইতিহাসে নরওয়ের মাটিতে ভূমিষ্ঠ হওয়া প্রথম রাজকীয় উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনিই। শৈশবেই এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের মুখোমুখি হন তিনি; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি নরওয়ে দখল করে নিলে মাত্র তিন বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত শৈশব কাটিয়ে ১৯৪৫ সালে যুদ্ধাবসানের পর নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন এবং সাধারণ আর দশটি শিশুর মতোই সরকারি স্কুলে পড়াশোনা শেষ করেন।
১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নরওয়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন পঞ্চম হ্যারাল্ড। সিংহাসনে বসে গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নরওয়ের প্রাচীন রাজতন্ত্রকে গণমুখী ও আধুনিক অবয়ব দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি প্রথা ভাঙার সাহস দেখিয়েছিলেন। রাজপরিবারের দীর্ঘদিনের কঠোর রীতির বাইরে গিয়ে ১৯৬৮ সালে সাধারণ পরিবারের মেয়ে সনিয়া হারালদসেনকে বিয়ে করেন। বাবার তীব্র আপত্তির কারণে এই প্রণয়কে পরিণয়ে রূপ দিতে তাঁকে দীর্ঘ নয় বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জনগণের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছানোর অনন্য গুণ ছিল পঞ্চম হ্যারাল্ডের। ২০১১ সালে কুখ্যাত ডানপন্থী উগ্রবাদী আন্দের্স বেরিং ব্রেইভিকের নৃশংস হামলায় ৭৭ জন প্রাণ হারালে, তখন তাঁর আবেগঘন ও ঐক্যবদ্ধকারী ভাষণ শোকস্তব্ধ জাতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। দেশের যেকোনো বড় বন্যা, প্রাকৃতিক ঝড় কিংবা দুর্যোগে তিনি প্রটোকল ভেঙে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ছুটে যেতেন। হ্যারাল্ডের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে একটি যুগের অবসান ঘটল। এখন দেশটির প্রচলিত রাজবংশীয় উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর ৫৩ বছর বয়সী পুত্র ক্রাউন প্রিন্স হাকন নরওয়ের পরবর্তী রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ১৯০৫ সালে সুইডেনের অধীনতা থেকে স্বাধীন হওয়ার পর হাকন হবেন নরওয়ের চতুর্থ রাজা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।