কাঠমান্ডু ও বেইজিং: নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসের পর ভোটেকোশি নদীর প্রলয়ংকরী বন্যায় পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। হিমালয় অঞ্চলের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬২৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিয়ে, যা বর্তমানে অন্তত ২ হাজার ৪২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা যত এগোচ্ছে, হতাহত ও নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান ততই পরিবর্তিত হচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলে এক গভীর মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির সীমান্ত এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে ১ হাজার ৯২৪ জন হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া আজ শনিবার সকালে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তিব্বত অংশে এ পর্যন্ত সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৫৪ জন। গত বৃহস্পতিবারের তুলনায় নিখোঁজের এই সম্মিলিত সংখ্যা এক লাফে এক হাজারের বেশি বেড়েছে।
এই বিপর্যয়ে প্রাণহানির পাশাপাশি নিখোঁজদের তালিকায় বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের নাম উঠে আসায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নেপালের সরকারি তথ্যমতে, নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জনই বিদেশি। তাঁদের মধ্যে পর্যটক যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন ওই অঞ্চলে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকেরা। অন্যদিকে, চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের সীমান্ত অংশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬০ জন ভিনদেশি নাগরিক। সব মিলিয়ে দুর্যোগকবলিত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অন্তত ৭৭৭ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নেপাল পর্যটন বোর্ড গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৬২২ জন পর্যটকের সঙ্গে বর্তমানে ‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন’ অবস্থায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৪৭৩ জনই বিদেশি নাগরিক এবং বাকি ১৪৯ জন স্থানীয় নেপালি। তবে এখন পর্যন্ত ১২১ জন পর্যটককে সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। নিখোঁজ নেপালিদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এই সংখ্যা ১২৭ বলে উল্লেখ করেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বন্যায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা কয়েক শ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই দুর্যোগের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন তাদের দেশের নাগরিক। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ৯৮ জন নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে, যদিও ৮৫ জনকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ৯৫ জন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, বাকি ৯০ জনের কোনো হদিস নেই।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ইউক্রেনের ৬২ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং লাটভিয়ার ২৯ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সহকারী অভিবাসনমন্ত্রী ম্যাট থিসলথওয়েট আজ অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, রাতারাতি নিখোঁজ অস্ট্রেলীয় নাগরিকের সংখ্যা বেড়ে ৪১ জনে দাঁড়িয়েছে। কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, তাদের ৩০ জন নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তালিকায় আরও রয়েছে মালয়েশিয়ার ৫১ জন, দক্ষিণ কোরিয়ার ৯ জন, রাশিয়ার ৯ জন, সিঙ্গাপুরের ৯ জন এবং জার্মানির ৮ জন নাগরিকের নাম।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, স্রোতের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে অনেক মৃতদেহ ভেসে ভারতের সীমানা পর্যন্ত চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই জনপদগুলোতে এখন কেবল ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। নিখোঁজদের স্বজনেরা বুকভরা আশা আর শঙ্কা নিয়ে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।