পদ নেই কিন্তু কর্মকর্তা ১৫০০! প্রশাসনে ‘আস্থাভাজন’ খোঁজার নেপথ্যে কী?

দেশের জনপ্রশাসনে বর্তমানে এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন ভারসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে এক শ্রেণির কর্মকর্তার কাঁধে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের গুরুভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে কয়েক শ কর্মকর্তা কোনো কাজ ছাড়াই দিনের পর দিন অলস সময় পার করছেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ‘আস্থাভাজন’ ও ‘যোগ্য’ কর্মকর্তার আকালের দোহাই দিয়ে এই অসম বণ্টন চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জনপ্রশাসনে বর্তমানে পদের চেয়ে কর্মকর্তার সংখ্যা অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, যুগ্ম সচিবের ৫০২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে দায়িত্বরত আছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা। অর্থাৎ পদের চেয়ে তিনগুণ বেশি কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও অনেককে একই সঙ্গে দুই বা তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় সাড়ে ৬৫০ জন কর্মকর্তা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। প্রশাসনের এই বিশাল জনবলকে যথাযথভাবে কাজে না লাগিয়ে কেবল ‘আস্থা’র প্রশ্নে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবিরের উদাহরণটি বর্তমান পরিস্থিতির এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি বর্তমানে নিজ দপ্তরের পাশাপাশি জেলা ও মাঠ প্রশাসন এবং কমিটি ও অর্থনৈতিক—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি কেনাকাটা থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষার মতো স্পর্শকাতর কাজগুলো তাঁর একার হাতে ন্যস্ত। একইভাবে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কারসহ তিনটি অনুবিভাগ সামলাচ্ছেন। এই চিত্র কেবল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেই নয়, বরং স্বরাষ্ট্র, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য ও তথ্যসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়েই বিদ্যমান।

বিপরীত দিকে, গত জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে অথবা করা হয়েছে ওএসডি। গত ২৮ জুলাই এক আদেশেই ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় বর্তমান সরকার। প্রশাসনে এই যে ‘আস্থাভাজন’ খোঁজার লড়াই, তাতে মূলত পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাই প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছিল যে, প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি হবে মেধা ও যোগ্যতা, কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

সাবেক সচিব ও বিপিএটিসি’র সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কোনো সরকারই তাদের রাজনৈতিক আদর্শের বাইরের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চায় না। ফলে একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা চূড়ান্তভাবে কাজের গতি কমিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করে।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে ঢালাও রাজনীতিকীকরণের কারণে প্রশাসন তার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি হারিয়ে ফেলেছে। দক্ষ কর্মকর্তার বদলে অনুগত কর্মকর্তার সন্ধানে ব্যস্ত থাকায় সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পদ না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতির যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা জনপ্রশাসনকে একটি অকার্যকর ও স্থবির প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।