৫৪ বছরের ইতিহাস: কেন মাত্র চারজন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন?

বাংলাদেশের ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদটি বরাবরই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কিংবা চরম অস্থিরতার সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৯ জন ব্যক্তি বিভিন্ন মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র চারজন তাদের নির্ধারিত ৫ বছরের মেয়াদ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন। বাকিদের কাউকেও হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে, কেউ পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়েছেন।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কোনো রাষ্ট্রপতিই আজ পর্যন্ত নিজের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। অন্যদিকে, যারা সফলভাবে মেয়াদ শেষ করেছেন, তারা সবাই ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর অলঙ্কারিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র তিনজন জীবিত আছেন। তাদের মধ্যে মো. আবদুল হামিদ টানা দুই মেয়াদ শেষ করে স্বাভাবিক অবসরে গেছেন। তবে সর্বশেষ ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন বিতর্ক ও অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পর সাংবিধানিক নিয়ম মেনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলান। পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি শপথ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পুনরায় তার মূল দায়িত্বে ফিরে গেছেন।

অসুস্থতা ও রাজনৈতিক চাপে সাহাবুদ্দিনের বিদায়
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান তার বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে তাকে পদত্যাগের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি গুলশানে নিজ বাসভবনে নিভৃত জীবন যাপন করছেন। তিনি জানিয়েছেন, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও 'অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি'র মতো জটিল রোগে তিনি ভুগছেন। তবে অবসর সময়ে তিনি বঙ্গভবনের স্মৃতি নিয়ে একটি বই লিখছেন।

আবদুল হামিদের রেকর্ড ও অন্যান্যদের ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাসে টানা ১০ বছর দায়িত্ব পালন করে রেকর্ড গড়েছেন মো. আবদুল হামিদ। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে তাকে যে রাজকীয় 'গার্ড অব অনার' দিয়ে বিদায় জানানো হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। বর্তমানে তিনিও অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে নিকুঞ্জের বাসভবনে সময় কাটাচ্ছেন।

তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে আবদুর রহমান বিশ্বাস একটি মাইলফলক স্থাপন করেছিলেন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থায় তিনি প্রথম পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেন। এর আগে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার নির্বাচিত হলেও ১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। পরবর্তীতে এরশাদ দীর্ঘ ৯ বছর ক্ষমতায় থাকলেও নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে তাকে গদি ছাড়তে হয়।

সংবিধান ও ক্ষমতার পালাবদল
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে প্রথম সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে বঙ্গভবনের ইতিহাস বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা, কখনো সংসদীয় ব্যবস্থা—এই রদবদলের মাঝে আবু সাঈদ চৌধুরী, মুহম্মদুল্লাহ্, বিচারপতি সায়েম কিংবা খন্দকার মোশতাকের মতো ব্যক্তিদের স্বল্পমেয়াদী উপস্থিতি দেখা গেছে। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হয়ে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করলেও পরে দলটির সাথে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। এরপর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ও জিল্লুর রহমানের আমলগুলোও ছিল নানা রাজনৈতিক নাটকীয়তায় ভরপুর।

বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি কখনো হয়েছে ক্ষমতার পরম উৎস, আবার কখনো রাজনৈতিক সমঝোতার প্রতীক। কিন্তু সব ছাপিয়ে বঙ্গভবনের ইতিহাস আজও এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চ ও অস্থিরতার দলিল হয়ে আছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।