দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চতর গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রমের দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ এখন থেকে আর সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হবে না। বরং এই বিশাল অংকের অর্থ সরাসরি ইউজিসির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত ও ব্যয় হবে। কমিশনের এই নতুন ‘মডেল’ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠগুলোর শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, গবেষণার অর্থ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘একাডেমিক’ স্বাধীনতা খর্ব হবে এবং নতুন করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সৃষ্টি হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এই সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করে জানিয়েছেন, বরাদ্দ ইউজিসি থেকে নিয়ন্ত্রিত হলে গবেষণার গতি মন্থর হয়ে যাবে। তাঁর মতে, হয়তো গুটিকয়েক ব্যক্তি গবেষণার সুযোগ পাবেন, কিন্তু সার্বিকভাবে নিয়মিত গবেষণার যে ধারাটি রয়েছে তা স্থবির হয়ে পড়বে। এই সংকট নিরসনে আগামী ৯ জুলাই ইউজিসি চেয়ারম্যান মামুন আহমেদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
বর্তমানে ইউজিসির অধীনে ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যাদের বাজেটের বড় একটি অংশ সরকারি অনুদান হিসেবে আসে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকার বাজেটে সরকার ইউজিসির মাধ্যমে ৯৪৯ কোটি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত অর্থবছরে গবেষণার জন্য ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এবার নতুন নিয়মের অজুহাতে কোনো সরাসরি অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শারমিনা নাসরীন জানিয়েছেন, এটি সরকারের একটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত এবং গবেষণার অর্থায়ন পদ্ধতিকে আরও ‘স্বচ্ছ’ ও ‘টেকসই’ করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ইউজিসি অবশ্য দাবি করছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তারা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মোট ২২৬ কোটি টাকা গবেষণা বরাদ্দ রেখেছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। তাদের যুক্তি হলো, গবেষণা প্রকল্পে ‘ডুপ্লিকেশন’ বা দ্বৈততা এড়াতে এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতেই এই কেন্দ্রীয় পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের চাপেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যদিও এ নিয়ে ইউজিসির ভেতরেও এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে।
অন্যদিকে, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষকরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনুষদগুলোর মাধ্যমে গবেষণা প্রকল্প যাচাই-বাছাই করলে যে সূক্ষ্ম মূল্যায়ন সম্ভব, তা ঢাকার কেন্দ্রীয় অফিস থেকে করা কঠিন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. ইলিয়াছ হোসাইনের মতে, আমলারা গবেষণার মান কতটুকু বুঝবেন তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে যায়।
বাংলাদেশের উচ্চতর গবেষণার প্রেক্ষাপট যখন বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই এমন সিদ্ধান্ত নতুন তর্কের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, ‘স্কোপাস’ ইনডেক্সড প্রকাশনায় বাংলাদেশের গবেষকদের অংশগ্রহণ ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে এবং ২০২৫ সালে গবেষণার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ‘এলসভিয়ার’-এর বিশ্বসেরা গবেষকদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষক। এমন এক সম্ভাবনাময় সময়ে গবেষণার ‘বাজেট’ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই টানাপোড়েন দেশের উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক হাসিনা খান মনে করেন, সিদ্ধান্তটি যদি পরীক্ষামূলক হয় তবে এর ফলাফল দেখার জন্য অপেক্ষা করা যেতে পারে, তবে তা যেন কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তাকে ক্ষুণ্ন না করে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।