কোটা সংস্কারের ঐতিহাসিক প্রতিফলন: প্রাথমিকে ৪৬ হাজার প্রার্থীর ফল পুনরায় প্রকাশের নির্দেশ

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে মেধাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল উচ্চ আদালত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পুরোনো কোটা পদ্ধতি বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে ফলাফল পুনরায় প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এই রায়ের ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় ৪৬ হাজার ১৯৯ জন পরীক্ষার্থীর ভাগ্য নতুন করে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে, কোটা পদ্ধতির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে আইনি লড়াই চালানো ১৫১ জন রিটকারীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে নিয়োগ প্রদানের জন্য সরকারকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যমান ৮৪ শতাংশ কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সুপ্রিম কোর্টের নতুন ‘জাজমেন্ট’ অনুযায়ী এখন থেকে ৯৩ শতাংশ নিয়োগই মেধার ভিত্তিতে হতে হবে। ফলে আগের কোটাভিত্তিক ফলাফল বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে পুনরায় ‘অ্যাসেসমেন্ট’ বা মূল্যায়ন করে নতুন তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

আদালতে রিটকারীদের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, পূর্বের ‘সার্কুলার’ অনুযায়ী কোটার প্রভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয়েছিলেন। জুলাই আন্দোলনের পর সুপ্রিম কোর্ট কোটা সংস্কার করে যে রায় দিয়েছিল (সিপি নম্বর ২৫১৬ অব ২০২৪), তার আলোকেই আজকের এই রায় প্রদান করা হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই ১৫১ জন রিটকারীকে নির্দিষ্ট ‘ডেডলাইন’ বা ৬০ দিনের মধ্যেই সহকারী শিক্ষক পদে পদায়ন করতে হবে।

তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে আদালত একটি বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। মামলাটি চলাকালীন সময়ে যারা এরই মধ্যে কোটা পদ্ধতিতে নিয়োগ পেয়ে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন, সেই ৬ হাজার ৫৩১ জন শিক্ষকের নিয়োগ ‘ন্যায্যতার স্বার্থে’ বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের চাকরি আপাতত ঝুঁকিমুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল মেধাই হবে প্রধান মাপকাঠি।

আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে সরকারি চাকুরিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পথে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে মেধাবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া মানেই দেশের বুনিয়াদি শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হওয়া। আপিল বিভাগের এই রায় এখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে কয়েক হাজার চাকরিপ্রত্যাশীর জন্য আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।