দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীত দুনিয়ার বর্তমান সময়ের অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক অনিরুদ্ধ রবিচন্দর। ২০১২ সালে ‘হোয়াই দিজ কোলাভেরি ডি’ গান দিয়ে বিশ্বজুড়ে যে তরুণের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল, তিনি এখন একের পর এক মেগা বাজেটের ভারতীয় সিনেমার তুরুপের তাস। ‘জেলার ২’সহ বেশ কয়েকটি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র নিয়ে যখন সর্বত্র চর্চা তুঙ্গে, ঠিক তখনই সংবাদের শিরোনামে উঠে এলো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়। ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান সান গ্রুপের চেয়ারম্যান কালানিধি মারানের একমাত্র কন্যা কাব্য মারানের সঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পড়তে যাচ্ছেন এই সুরকার। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর মাসেই রাজকীয় আয়োজনে সম্পন্ন হতে চলেছে তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।
এই আলোচিত বিয়ের গুঞ্জনটি নতুন মাত্রা পায় তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেভন্ত রেড্ডির একটি আনুষ্ঠানিক পোস্টের পর। গত ১৭ অক্টোবর কালানিধি মারান ও তাঁর সহধর্মিণী কাবেরী মারানের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে তিনি জানান, মারান দম্পতির একমাত্র মেয়ের বিবাহোত্তর সংবর্ধনায় অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন তিনি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, আগামী ২১ নভেম্বর ভারতের চেন্নাই শহরে জমকালো এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে মূল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে পারে ইউরোপের দেশ গ্রিসে, যার সম্ভাব্য তারিখ আগামী ১১ নভেম্বর। যদিও মারান বা রবিচন্দর পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত সময়সূচি নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি।
কে এই কাব্য মারান?
ভারতের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম টাইকুন কালানিধি মারানের কন্যা হিসেবে কাব্য মারানের পরিচয় সর্বজনবিদিত। তাঁর পিতা সান টিভি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার। টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, বিনোদন ও সংবাদ মাধ্যমসহ দক্ষিণ ভারতের বিশাল ব্যবসায়িক জগতে সান গ্রুপের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। কাব্যর মা কাবেরী মারানও প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের অন্যতম চালিকাশক্তি।
পড়াশোনায় কাব্য বরাবরই ছিলেন মেধাবী। ভারতের চেন্নাইয়ের ঐতিহ্যবাহী স্টেলা মারিস কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে খ্যাতনামা ওয়ারউইক বিজনেস স্কুল থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। উচ্চশিক্ষা শেষে পরিবারের ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং মেধার পরিচয় দেন। বর্তমানে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) দল ‘সানরাইজার্স হায়দরাবাদ’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ক্রিকেটের মাঠে খেলোয়াড়দের মেগা নিলাম থেকে শুরু করে দলের ডাগআউট—সবখানেই কাব্য মারানের উজ্জ্বল উপস্থিতি ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। দল গঠন, স্ট্র্যাটেজি তৈরি এবং কোটি টাকার খেলোয়াড় কেনাবেচায় তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বারবার প্রশংসিত হয়েছে। ফলে কোটিপতি বাবার সন্তান পরিচয়ের বাইরেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে একজন সফল ও দূরদর্শী ক্রীড়া ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি নিজের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছেন।
মারান পরিবারের ২৫ হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য
ভারতের হুরুন রিচ লিস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ তথ্যমতে, কালানিধি মারানের মোট ব্যক্তিগত সম্পদের আনুমানিক আর্থিক মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ফোর্বসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তাঁর সম্পদের পরিমাণ ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করা সান টিভি নেটওয়ার্ক আজ কেবল দক্ষিণ ভারতেই নয়, গোটা দেশের শীর্ষ মিডিয়া হাউসে পরিণত হয়েছে। তাদের সম্প্রচারিত চ্যানেলগুলো ভারতের ১৪ কোটিরও বেশি পরিবারের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে যায়।
টেলিভিশন ছাড়াও এফএম রেডিও, সংবাদপত্র, ডিজিটাল ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং চলচ্চিত্র প্রযোজনার বিশাল বাণিজ্য রয়েছে এই পরিবারের। সেই বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় ক্রিকেট। ২০১২ সালে সান টিভি নেটওয়ার্ক আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি সানরাইজার্স হায়দরাবাদের মালিকানা কিনে নেয় এবং ২০১৩ সাল থেকে দল হিসেবে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে শুরু করে। তবে কালানিধি মারানের এই বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের অর্থ সরাসরি কাব্যর ব্যক্তিগত মূলধন নয়; বরং তিনি এই ঐতিহ্যবাহী সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান উত্তরাধিকারী।
ক্রিকেট গ্যালারির মধ্যমণি
আইপিএল মৌসুমে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের ম্যাচ চলাকালে ভিআইপি গ্যালারিতে কাব্য মারানের উচ্ছ্বাস, জয়োল্লাস কিংবা দলের পরাজয়ে বিষাদের অভিব্যক্তি প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়। দলের প্রতি তাঁর নিখাদ ভালোবাসা এবং খেলোয়াড়দের প্রতি অগাধ সমর্থন তাঁকে ক্রীড়ামোদী নেটিজেনদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক ব্যক্তিত্বে রূপ দিয়েছে। পোশাকের রুচিশীলতা থেকে শুরু করে ক্রিকেট মাঠে তাঁর প্রতিটি প্রতিক্রিয়াই নিয়মিত ট্রেন্ডে পরিণত হয়।
‘কোলাভেরি ডি’ থেকে অনিরুদ্ধের অবিশ্বাস্য উত্থান
অন্যদিকে বর অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের সংগীতযাত্রাও রূপকথার মতো। ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তামিল ছবি ‘থ্রি’-তে অভিনেতা ধানুশের কণ্ঠে ‘হোয়াই দিজ কোলাভেরি ডি’ গানটির সুর করে সংগীতজগতে প্রবেশ করেন অনিরুদ্ধ। গানটি সে সময় ইউটিউব ও সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তুলে সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
‘কাইথি’, ‘বেদালাম’, ‘মাস্টার’, ‘বিক্রম’, ‘জেলার’ এবং শাহরুখ খানের সর্বভারতীয় ব্লকবাস্টার ‘জওয়ান’ সিনেমায় তাঁর আবহসংগীত ও গান বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। তামিল সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে বলিউড ও তেলেগু ইন্ডাস্ট্রিতেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া এবং নির্মাতাদের প্রথম পছন্দের সংগীত পরিচালক তিনি। দুই ভিন্ন জগতের দুই সফল ব্যক্তিত্বের এই মিলন এখন বিনোদন ও করপোরেট দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।