‘ব্রেকিং ব্যাড’ তারকা আরজে মেটির মর্মান্তিক পরিণতি: ৩৪ বছরেই আত্মহননের পথ বেছে নিলেন ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র!

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা কালজয়ী মার্কিন টেলিভিশন ড্রামা সিরিজ ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা আরজে মেটি আর বেঁচে নেই। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই জীবনের নির্মম ইতি টেনে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিলে নিজ আবাসস্থলে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। অভিনেতার অফিশিয়াল মুখপাত্র ও প্রতিনিধি দল তাঁর মৃত্যুর বেদনাদায়ক খবরটি গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় পুলিশ ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের বরাতে জানানো হয়, তরুণ এই অভিনেতার মৃত্যুর কারণ ছিল আত্মহত্যা।

আন্তর্জাতিকভাবে নন্দিত এই ড্রামা সিরিজে কেন্দ্রীয় চরিত্র ওয়াল্টার হোয়াইটের প্রতিবন্ধী ছেলে ‘ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র’ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে সারাবিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি ও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন মেটি। সিরিজে কিংবদন্তি অভিনেতা ব্রায়ান ক্র্যানস্টনের ছেলের চরিত্রে তাঁর সাবলীল উপস্থিতি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। পর্দায় চরিত্রটির মতো মেটি নিজেও শৈশব থেকে সেরিব্রাল পালসির মতো জটিল স্নায়বিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে উঠেছেন। নিজের এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও জীবনসংগ্রামের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে তিনি অনন্য দক্ষতায় রূপালি পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। একই সঙ্গে বিনোদনজগতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের বলিষ্ঠ প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আজীবন লড়াই চালিয়েছেন এই তরুণ তারকা।

নির্মাতা ভিন্স গিলিগানের সৃষ্টি এবং ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করা ‘ব্রেকিং ব্যাড’ সিরিজের টানা পাঁচটি সফল মৌসুমেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আরজে মেটি। টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অপরাধবিষয়ক ড্রামা হিসেবে বিবেচিত এই প্রজেক্টে ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়রের ভূমিকায় তাঁর উপস্থিতি বিশেষভাবে দাগ কেটেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের জ্যাকসনে জন্মগ্রহণ করা মেটির জন্মের সময়েই মস্তিষ্কে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে তিন বছর বয়সে তাঁর শরীরে সেরিব্রাল পালসি রোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়। শৈশবেই এক দত্তক পরিবারের সান্নিধ্যে বড় হওয়া এই অদম্য তরুণ শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কখনো নিজের অভিনয় প্রতিভার প্রাচীর হতে দেননি; বরং নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েই তিনি প্রতিবন্ধী মানুষের যাপিত জীবনের সংগ্রামকে বৈশ্বিক পর্দায় অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর তুমুল সাফল্যের পর আরজে মেটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে তিনি নিয়মিত কাজ করেছেন। তাঁর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় ড্রামা ‘সুইচড অ্যাট বার্থ’, সাই-ফাই থ্রিলার ‘দ্য রিকল’, ‘দ্য ওক রুম’ এবং বিশ্বখ্যাত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের সুপারহিরোভিত্তিক আলোচিত সিরিজ ‘দ্য গার্ডিয়ানস অব জাস্টিস’। তবে কেবল অভিনয়ের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি; আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ‘ইউনাইটেড সেরিব্রাল পালসি’ এবং ‘শ্রাইনার্স চিলড্রেনস’-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ সময়। পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থা ‘মিটে ফাউন্ডেশন’-এর ব্যানারে নানামুখী জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করেছেন। সমাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা ভেঙে বিনোদন ও শিল্পাঙ্গনে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত।

মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও পেশাগত কাজের মধ্যেই ডুবে ছিলেন এই অভিনেতা। তাঁর অভিনীত আসন্ন নতুন চলচ্চিত্র ‘টকিং টু স্ট্রেঞ্জার্স’-এর প্রচারণা নিয়ে তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছিলেন তিনি। এই সিনেমাটিতেও সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত এক লড়াকু ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেছেন মেটি। ছবির অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগে বিশেষ প্রদর্শনীতে অংশ নেন এবং চলতি অক্টোবর মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কে এক জমকালো পাবলিক ইভেন্টে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ভক্তদের মাঝে হাজির হয়েছিলেন তিনি।

পেশাগত সফলতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিলেন এই হলিউড তারকা। ২০১৮ সালে প্রণয়ের সূচনা ঘটার পর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা কেনেডি সুয়ারেজের সঙ্গে ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বাগ্‌দান সম্পন্ন হয়েছিল। দাম্পত্য জীবনের নতুন স্বপ্ন যখন ডানা মেলছিল, ঠিক তখনই টেক্সাসের মাটিতে তাঁর এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক আত্মহননের খবর আন্তর্জাতিক বিনোদন অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।