বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নব্বই ও ২০০০-এর দশকের সূচনালগ্নে যখন অশ্লীলতার কালো থাবা জাঁকিয়ে বসেছিল, তখন সেই অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্না। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, তাঁর অভিনীত বাণিজ্যিক অ্যাকশন ছবি ‘ফায়ার’ মুক্তির পরপরই সিনেমাটিতে আপত্তিকর ও অশ্লীল দৃশ্য থাকার অভিযোগে খোদ মান্নাকেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। সেই বিতর্কের প্রায় দুই যুগ বা দীর্ঘ ২৪ বছর পর সম্প্রতি জনসমক্ষে আসা একটি অপ্রকাশিত ভিডিও বার্তায় এই রহস্যের অবসান ঘটিয়েছেন প্রয়াত এই নায়ক নিজেই। সেখানে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, অপসংস্কৃতির সঙ্গে আপস না করে ছবির মাত্র অর্ধেক শুটিং শেষ করেই তিনি কাজ থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছিলেন; এমনকি সিনেমাটির জন্য নিজের কণ্ঠে কোনো ডাবিংও করেননি তিনি।
প্রয়াত এই নায়কের নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কৃতাঞ্জলি’ সূত্রে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা ওই ঐতিহাসিক ভিডিওতে মান্নাকে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, "‘ফায়ার’ নামে যে ছবিটি আমি করেছিলাম, সেই ছবিতে অর্ধেক কাজ করার পরে আমি আর কাজ করিনি। এমনকি আমি সিনেমায় ভয়েসও দিই নাই। আমি ডাবিংয়েও যাই নাই।"
২০০২ সালে ছবিটি যখন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল, তখন ঢালিউডে তুমুল শোরগোল সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মান্নার সহধর্মিণী শেলী মান্না প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে জানান, সিনেমাটির পুরো কাজ মান্না কখনোই শেষ করেননি। তাঁর দাবি, মান্না শুটিং বর্জন করার পর তাঁর অগোচরে তাঁর বিকল্প হিসেবে একজন বডি ডাবল বা ‘ডামি’ ব্যবহার করে কিছু বিতর্কিত দৃশ্যের দৃশ্যধারণ সম্পন্ন করা হয়েছিল। ছবির এই ধরনের মুক্তি ও কৃত্রিম দৃশ্য সংযোজন নিয়ে মান্না ব্যক্তিগতভাবে চরম ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত ছিলেন।
শেলী মান্না স্মৃতিচারণ করে বলেন, "এটা অনেক বছর আগের কথা। পুরোটা মনে নেই। তবে মুক্তির পরে দর্শক ও সমালোচকেরা যেসব বিষয় নিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন, সেসব নিয়ে মান্নার সঙ্গে প্রযোজকের দ্বন্দ্ব হয়েছিল। মান্না জেনেশুনে কখনোই কোনো অশ্লীল সিনেমায় অভিনয় করবে না। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সে নিজেই লড়েছে।"
উন্মোচিত হওয়া ওই ভিডিওতে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয়ের যাবতীয় অপবাদ তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন এই সুপারস্টার। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মান্না বলেন, "পুরো সিনেমায় আমার কো–আর্টিস্ট বা অন্য শিল্পীরা এবং ডিরেক্টর, প্রযোজক কে কী করছে, সেটা আমার যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, আমি কোনো অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয় করিনি।"
ভিডিওতে প্রযোজকের সঙ্গে গভীর মতানৈক্যের কারণে প্রজেক্টটি অসমাপ্ত রেখে চলে আসার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করলেও, ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট ঘটনার কারণে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল, তার বিশদ ব্যাখ্যা দেননি তিনি। এ বিষয়ে তাঁর স্ত্রী শেলী মান্না আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনে বলেন, "মান্না বুঝতে পেরেছিল, সিনেমায় অন্য রকম কিছু হচ্ছে, যা তার সঙ্গে যায় না। তার মনে হয়েছিল, তাকে ছাড়াই অপ্রাসঙ্গিক কিছু দৃশ্যের শুটিং হয়েছে। পাইরেসিসহ নানা বিষয় নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল। এ কারণে মান্না পরে সিনেমা থেকে সরে দাঁড়ায়। প্রযোজক ও পরিচালক পরে ডামি ব্যবহার করে শুটিং শেষ করে ছবিটি মুক্তি দেন। এখন খুব বেশি কিছু মনে নেই।"
চলচ্চিত্রের অন্ধকার যুগে ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ সুস্থ রাখতে নিজের একক লড়াইয়ের কথা জানিয়ে ভিডিওতে মান্না গর্বের সঙ্গে বলেন, "বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আমি সব সময় অশ্লীলতা নিয়ে প্রতিবাদ করেছি।" স্বামীর সেই নীতিবান অবস্থানের প্রতিধ্বনি করে শেলী মান্নাও বলেন, "সে অশ্লীল সিনেমায় কখনোই অভিনয় করেনি। কেউ যেন এমন সিনেমা না বানায়, সেটা নিয়েও কথা বলেছে। একসময় তার যুদ্ধটা একার ছিল।"
তবে পুরো ইন্ডাস্ট্রির বিপক্ষে গিয়ে একাকী এই লড়াই মান্নাকে মানসিকভাবে কতটা ক্লান্ত এবং একা করে দিয়েছিল, তার গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভও ফুটে উঠেছে ওই ভিডিও বার্তার শেষাংশে। গভীর বেদনায় মান্না বলেন, "অশ্লীলতা নিয়ে একার পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আমি একা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। অশ্লীল সিনেমা সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। কারণ, আমাকে নিয়ে এসব কারণে চলচ্চিত্র অঙ্গনে অনেক আলোচনা–সমালোচনা হয়েছে। অনেক সময় বিপদের মুখোমুখিও হয়েছি।"
এদিকে তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতি সম্পর্কে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক এক শীর্ষ নেতা প্রথম আলোকে জানান, সেই সময় অনেক মূলধারার সিনেমাতেই সেন্সর ছাড়পত্রের বাইরে গিয়ে জোরপূর্বক অশ্লীল দৃশ্য বা ‘কাটপিস’ জুড়ে দেওয়া হতো। চলচ্চিত্র অঙ্গনের শীর্ষ নায়ক হিসেবে মান্না এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। শুধু মুখের কথায় নয়, তিনি কয়েকজন সচেতন পরিচালক, ফাইট ডিরেক্টর এবং কারিগরি কলাকুশলীদের সঙ্গে নিয়ে অশ্লীলতামুক্ত সুস্থ সামাজিক ছবি নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন। ওই নেতার দাবি, অশ্লীলতার চরম বিরোধিতার পাশাপাশি ‘ফায়ার’ সিনেমার শুটিং শিডিউল নিয়েও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল, যা মান্নাকে ছবিটি থেকে চূড়ান্তভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করে।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালে আলোড়ন তোলা ‘ফায়ার’ সিনেমাটি একাধারে পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছিলেন মোহাম্মদ হোসেন এবং ছবিটির মূল নায়িকা চরিত্রে ছিলেন পলি। তবে প্রযোজক ও পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ও ডামি ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।