১২ ঘণ্টার নাটকীয়তা শেষ: মধ্যরাতে যে শর্তে থানা থেকে ছাড়া পেলেন কুমিল্লার সেই বিএনপি নেতা!

টানা ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর নাটকীয়তা ও তুমুল উত্তেজনার পর অবশেষে থানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুম। গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে নিজ বাসা থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। এরপর দিনভর নানা জল্পনাকল্পনা ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অবশেষে এদিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের জিম্মায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।


আটকের পর থেকেই রেজাউল কাইয়ুমকে হেফাজতে নেওয়ার বিষয়টি পুলিশ নিশ্চিত করলেও, ঠিক কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছিল-সে বিষয়ে দীর্ঘ সময় লুকোচুরি ও গড়িমসি চলে। তবে মধ্যরাতে এই প্রভাবশালী বিএনপি নেতাকে ছেড়ে দেওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে মুখ খোলা হয়। জানানো হয়, কুমিল্লার অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ততম শাসনগাছা বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক এক বিশাল চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। মূলত সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে থানায় আনা হয়েছিল। পুলিশের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও এসব অভিযোগের কোনো শক্ত প্রমাণ বা সত্যতা না পাওয়ায় তাঁকে সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।


এর আগে, গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা এলাকার নিজ বাসভবন থেকে রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করেন কোতোয়ালি মডেল থানা ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি যৌথ দল। পরে কড়া নিরাপত্তায় তাঁকে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।


আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফুঁসে ওঠেন স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মী ও তাঁর অনুসারীরা। প্রতিবাদ ও তাৎক্ষণিক মুক্তির দাবিতে তাঁরা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে কড়া অবস্থান নেন। দুপুর থেকে শুরু করে মধ্যরাতে তাঁকে ছাড়ার আগ পর্যন্ত থানার প্রধান ফটকের সামনে কয়েক শ নেতা-কর্মী ভিড় জমিয়েছিলেন। এ সময় রেজাউলের মুক্তির দাবিতে ক্রমাগত বিভিন্ন স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে থানা চত্বর।


রাতে থানা থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসার পর রেজাউল কাইয়ুম দাবি করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিল। উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাকে নিয়ে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল; অবশেষে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ভিত্তিহীন অভিযোগে আমাকে আটক করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়, তার বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। আমি আমাদের নেতা–কর্মীরসহ সকলের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দিনভর আমার জন্য যাঁরা কষ্ট করেছেন, সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’


এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি নির্দেশেই এই বিএনপি নেতাকে আটক করা হয়েছিল। সূত্র জানায়, শাসনগাছা বাস টার্মিনাল এবং এর আশপাশের এলাকায় সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন রুটের যানবাহনে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। বিশেষ করে, সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাসনগাছা বাস টার্মিনালের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চাঁদা তোলার ঘটনায় রেজাউল কাইয়ুম, তাঁর ভাই এবং স্থানীয় বিএনপির কিছু অনুসারী ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। রেজাউল কাইয়ুমের বাসভবনও এই টার্মিনালের একেবারেই সন্নিকটে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতে তাঁর এই চাঁদাবাজির বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে এবং এরপরই পুলিশকে আটকের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সর্বশেষ, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘সবুজ সংকেত’ বা গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরই ১২ ঘণ্টার মাথায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।


এই নেতার আটকের পর শাসনগাছা বাস টার্মিনালে তাঁর একচ্ছত্র প্রভাবের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গতকাল দুপুরে তাঁকে আটকের খবর চাউর হতেই টার্মিনাল অবরোধ করে ফেলেন বিভিন্ন পরিবহনের চালক, শ্রমিক ও তাঁর অনুসারীরা। মুহূর্তে ওই টার্মিনাল থেকে কুমিল্লা-ঢাকা, কুমিল্লা-সিলেটসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি রেজাউলের অনুসারী একদল যুবক স্থানীয় ব্যবসায়ীদের রীতিমতো হুমকি দিয়ে ওই এলাকার সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য করেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা চরম অচলাবস্থা চলার পর গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে টার্মিনাল থেকে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয় এবং দোকানপাট খুলতে শুরু করে।


এ বিষয়ে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, রেজাউল কাইয়ুমের বিরুদ্ধে শাসনগাছা বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি–সংক্রান্ত কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উচ্চপর্যায়ে জমা পড়েছিল। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের কড়া নির্দেশে তাঁকে আটক করে হেফাজতে নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জিজ্ঞাসাবাদ ও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ কারণেই রাতে আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সফিউল আলম রায়হানসহ অন্য নেতাদের জিম্মায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।


তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে, থানা থেকে ছাড়ার আগে বিএনপি নেতা রেজাউল কাইয়ুমের কাছ থেকে একটি লিখিত মুচলেকা আদায় করা হয়েছে। সেখানে তিনি শাসনগাছা এলাকায় যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি নির্মূলে প্রশাসনকে সহায়তা করবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন।


মধ্যরাতে থানা থেকে রেজাউল কাইয়ুমের বেরিয়ে আসার পর তাঁর অপেক্ষমাণ অনুসারীদের মধ্যে বাঁধভাঙা আনন্দ–উচ্ছ্বাস দেখা যায়। রাত ১২টা ১৫ মিনিটে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সফিউল আলম (রায়হান) সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা রেজাউল কাইয়ুমকে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমাদের উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ের বিস্তারিত পুলিশই আপনাদের জানাবেন।’


এর আগে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে সফিউল আলম দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিলেন, বাস টার্মিনালের কোনো ঘটনার সঙ্গেই রেজাউল কাইয়ুম যুক্ত নন এবং এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর দাবি ছিল, একটি মহল ষড়যন্ত্র করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি সামনে এনেছে।


উল্লেখ্য, গতকাল দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় এক ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে। দিনভর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে বসিয়ে রেজাউল কাইয়ুমকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিকসহ ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা এই জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। রাত ১০টার দিকে তাঁকে ওসির কক্ষ থেকে সরিয়ে থানার নারী ও শিশুবিষয়ক সেবা দেওয়ার একটি কক্ষে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকেই রাত ১২টার দিকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।


পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের মুঠোফোনে রোববার দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিক বলেন, ‘আমরা বিএনপি নেতা রেজাউল কাইয়ুমকে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিলাম।’


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।