উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা সুনামগঞ্জে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি ও উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় বোরো ফসলের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। আজ সোমবার সকাল থেকেই জেলাজুড়ে বজ্রসহ অবিরাম ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে, যা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সম্ভাব্য অকাল বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং কৃষকের উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলা নিশ্চিত করতে আজ দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ ছাড়াও উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সকল আইনপ্রয়োগকারী ও সেবামূলক দপ্তরের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠক শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন হাওরের বোরো ধান রক্ষা করা। তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করেছি। অনেক এলাকায় ইতোমধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। আমরা প্রতিটি এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা বা ‘অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন’ চালাচ্ছি যাতে কৃষকেরা দ্রুত ধান কাটা শেষ করতে পারেন। যেকোনো জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় আমাদের প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও পর্যাপ্ত ‘বাজেট’ বরাদ্দ রয়েছে।”
এদিকে, আবহাওয়া ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী আজ সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই বৃষ্টিপাত মঙ্গলবার থেকে আরও তীব্রতর হবে। বিশেষ করে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে আগামী তিন দিন অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে সীমান্ত নদীগুলোর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। পাউবোর কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, টানা বৃষ্টিতে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের মাটি অনেকটা নমনীয় হয়ে পড়েছে। ফলে উজানের ঢলের পানির চাপ সামলানো অনেক বাঁধের জন্যই কঠিন হতে পারে। উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকেরা এখন সময়ের সাথে পাল্লা দিচ্ছেন। হাওরের বোরো ধান এখনো পুরোপুরি পরিপক্ক না হলেও বন্যার আশঙ্কায় তাঁরা আধা-পাকা ধানই কেটে ফেলছেন। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন তাঁরা। অতিরিক্ত কাদা ও পানি জমে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার’ মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না, আবার শ্রমিকের সংকটও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের কৃষক আবদুল কাইউম (৬০) তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, “যেভাবে মেঘ ডাকছে আর বৃষ্টি পড়ছে, তাতে হাওরে কাজ করা জানের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কষ্টের ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেওয়া যায় না, তাই ভয় মাথায় নিয়েই ধান কাটছি।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। গতকাল রোববার পর্যন্ত গড়ে ৫২ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “শুরুতে খরা থাকায় এবার ধান পাকতে কিছুটা দেরি হয়েছে। তবে আমরা কৃষকদের সর্বোচ্চ কারিগরি ও পরামর্শমূলক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি যাতে দুর্যোগের আগেই ফসল গোলায় তোলা সম্ভব হয়।”
উজান থেকে নেমে আসা ঢল যদি স্থায়ী রূপ নেয়, তবে চলতি মৌসুমের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।