নিষেধাজ্ঞা শেষেও মেঘনায় ইলিশের আকাল! চাঁদপুরে এক কেজি ইলিশের দাম কত?

 মেঘনায় ইলিশ ধরার ওপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়েছে। জেলে ও ক্রেতা-উভয় পক্ষেরই প্রত্যাশা ছিল, জাল ফেললেই মিলবে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ, আর বাজার ভরে উঠবে ক্রেতাদের হাঁকডাকে। কিন্তু চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ ও মতলব উত্তর উপজেলার মাছবাজারগুলোর চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বাজারে ইলিশের সরবরাহ তলানিতে, আর যে অল্প কিছু ইলিশ চোখে পড়ছে, তার দাম স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি। আকাশচুম্বী এই দাম মধ্যবিত্তের একেবারে নাগালের বাইরে চলে গেছে।


মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেঘনায় প্রত্যাশিত হারে ইলিশ ধরা না পড়ার কারণেই বাজারে এমন তীব্র সাপ্লাই সংকট বা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।


আজ সোমবার সকাল ৯টার দিকে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদর, মুন্সীরহাট এবং মতলব উত্তর উপজেলার আমিরাবাদ ও ছেংগারচর মাছবাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় এক হতাশাজনক দৃশ্য। হাতে গোনা কয়েকটি ইলিশ নিয়ে ডালায় বসে আছেন বিক্রেতারা। দাম অস্বাভাবিক বেশি হওয়ায় বেচাকেনা নেই বললেই চলে। অনেক ক্রেতা বাজারে এসে দাম শুনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন, দরদাম করার সাহসও পাচ্ছেন না। প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় বিক্রেতাদের চেহারায়ও চরম হতাশার ছাপ।


মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদর মাছবাজারের বিক্রেতা পানু দাস তাঁর হতাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, গতকাল রোববার দুপুরে বেশি দামে কিনে চাঁদপুর থেকে ১১টি মাঝারি আকারের ইলিশ এনেছিলেন তিনি। কিন্তু আজ সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র চারটি মাছ। বাকিগুলো এখনো অবিক্রীত রয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্রেতা দরদাম করেই চলে যাচ্ছেন। তাঁর কাছে থাকা অবশিষ্ট সাতটি ইলিশ আদৌ বিক্রি হবে কি না, তা নিয়ে তিনি বেশ শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, গত চার দিন ধরে বাজার প্রায় ইলিশশূন্য অবস্থায় রয়েছে।


পানু দাসের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা এবং ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, এই দাম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। মেঘনায় ইলিশ কম ধরা পড়ায় বাজারেও এই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।


মাছ বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতারাও চরম ক্ষুব্ধ। বাজারে আসা গৃহবধূ ফেরদৌসী বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার দুই মাসে বাজারে ইলিশ দেখি নাই। ভাবছিলাম, নিষেধাজ্ঞার পর ইলিশ আইব। কম দামে কিনতেও পারুম। গত দুই দিন ধইরা ইলিশ কিনতে বাজারে আইতাছি। দুই-একটা ইলিশের দেখা মিললেও দামে মিলতাছে না। ইলিশের দামে আগুন লাগছে, কিনুম ক্যামনে। ইলিশ এখন ধনীগো মাছ।’


শুধু ক্রেতা-বিক্রেতারাই নন, মেঘনার বুকেও জেলেদের মধ্যে হাহাকার। মতলব উত্তর উপজেলার এখলাশপুর এলাকার জেলে গোলাম হোসেন নিজের আক্ষেপের কথা জানিয়ে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা শেষ অওনে খুশি হইছিলাম। গত তিন দিন ধইরা মেঘনায় জাল ফালাইতাছি। ইলিশ উঠতেছে না। হারা রাইত ট্রলারের তেল পোড়াইয়া পাওয়া যায় চার থেকে পাঁচটা ইলিশ। হেগুলি বেইচ্চা তেলের দামই উডে না। সংসারও চলতাছে না। খুব হতাশ লাগতাছে।’


এই সংকটের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে মতলব উত্তর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস জানান, মেঘনায় পানির চাপ এখনো তেমন বাড়েনি, মূলত এ কারণেই ইলিশ কম ধরা পড়ছে। তবে সামনে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ডেডলাইনে নদীর পানির চাপ বাড়লে জেলেদের জালে এবং বাজারে প্রত্যাশিত ইলিশ পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আপাতত রুপালি ইলিশের দেখা পেতে জেলে ও ক্রেতাদের সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষাই করতে হচ্ছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।