বাংলাদেশের রাজনীতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং প্রবীণ জননেতা তোফায়েল আহমেদের অন্তিম বিদায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আজ মঙ্গলবার তাঁর প্রিয় জন্মভূমি ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। নয়বারের নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য এবং সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রয়াণে ভোলার আকাশ-বাতাসে এখন গভীর শোকের আবহ। আজ ভোর থেকেই সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর পৈতৃক ভিটায় ভিড় করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, যাঁদের চোখেমুখে প্রিয় নেতাকে হারানোর হাহাকার স্পষ্ট।
পারিবারিক ও দলীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আজ দুপুরে ঢাকা থেকে বিশেষ হেলিকপ্টারযোগে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ ভোলায় নিয়ে আসা হবে। এরপর দ্বীপজেলার সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ নেওয়া হবে ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। সেখানে জোহরের নামাজের পর বেলা দুইটায় তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে বরেণ্য এই নেতার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়েছিল।
বিদ্যালয় মাঠের জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হবে তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম কোড়ালিয়ায়। সেখানে স্থানীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তৃতীয় দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নিজ বাবা-মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্থানীয় বাসিন্দারা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তোফায়েল আহমেদ কেবল একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ভোলার গণমানুষের প্রতিটি লড়াই-সংগ্রাম আর আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। তাঁর চিরবিদায়ে জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি আপসহীন ও তেজস্বী নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে ধ্রুবতারার মতো আবির্ভূত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিটি বাঁকে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি একাধিকবার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন এবং আমৃত্যু আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। রাজপথ থেকে সংসদ—সর্বত্রই তাঁর বাগ্মীতা আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।