পাহাড়ের নিস্তব্ধতা চিরে এখন কেবলই অসুস্থ শিশুদের আর্তনাদ। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সরকারিভাবে হাসপাতালটি মাত্র ৩১ শয্যার হলেও বর্তমানে সেখানে কেবল হামের উপসর্গ নিয়েই ভর্তি রয়েছে ৭০টি শিশু। অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের মিলিয়ে শতাধিক রোগীর চাপে হাসপাতালটির ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ফলে মেঝে কিংবা হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন অসহায় রোগীরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার কুরুকপাতা ইউনিয়নের পোয়ামুহুরী অস্থায়ী ক্লিনিক থেকে নতুন করে ১৫ শিশুকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর আগে থেকেই ৫৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। হাম ছাড়াও ম্যালেরিয়া এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আরও অন্তত ৩০ জন রোগী সেখানে ভর্তি রয়েছেন। ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন গুণ বেশি রোগী সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) মোহাম্মদ হানিফ জানান, হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও প্রশাসনিক অনুমোদনের অভাবে তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। ফলে ৩১ শয্যার বরাদ্দকৃত খাবার ও জনবল দিয়ে শতাধিক মানুষের সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অর্ধেক জনবল বর্তমানে দুর্গম কুরুকপাতার অস্থায়ী ক্লিনিকে নিয়োজিত থাকায় মূল হাসপাতালে নার্সিং ও চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় কুরুকপাতা ইউনিয়নের ম্রো বাসিন্দাদের জন্য সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ম্রো অধ্যুষিত এই এলাকায় গত এক মাস ধরে হামের প্রাদুর্ভাব প্রকট হয়েছে। দীর্ঘ ১২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে হাসপাতালে আসার সক্ষমতা অনেকের নেই বলে এলাকাটিতে এ পর্যন্ত ৪ জন শিশু বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ২৫ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে কুরুকপাতায় একটি অস্থায়ী ‘মেডিক্যাল ক্যাম্প’ বা ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে পাঠানোর কাজ করছে সেনাবাহিনী।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যানবিদ মিজানুর রহমান জানান, গত ২৮ মার্চ থেকে আলীকদমসহ পার্শ্ববর্তী লামা ও নাইক্ষ্যংছড়িতে হামের লক্ষণযুক্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছিল। তবে গত দুই সপ্তাহে ম্রো পল্লীগুলোতে সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। স্থানীয় ম্রো যুব সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো আক্রান্ত রোগীদের যাতায়াত ও তাঁদের অভিভাবকদের খাবারের যোগান দিয়ে সহায়তা করছেন। পাহাড়ের এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ বরাদ্দ ও পর্যাপ্ত টিকাদান কর্মসূচি চালুর দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।