আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেড় দশকের প্রথা ভাঙল: ১ জুলাই থেকে প্রথমবার শুরু হচ্ছে ‘অবকাশ’

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদী অবকাশকালীন ছুটিতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৫ বছরে এই বিশেষ আদালতটি দেশের অন্য সব সাধারণ আদালতের মতো কোনো নির্দিষ্ট অবকাশ বা ছুটির সুবিধা ভোগ করেনি। তবে সম্প্রতি ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধিতে ঐতিহাসিক এক সংশোধনী আনার মাধ্যমে এই নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত প্রথম দফার এই অবকাশকালীন ছুটি কার্যকর হতে যাচ্ছে।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে দেশ মিডিয়াকে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট এই সময়ে ট্রাইব্যুনালের নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম ও প্রকাশ্য শুনানি বন্ধ থাকলেও প্রশাসনিক ও রুটিন কাজগুলো চলমান থাকবে। মূলত উচ্চ আদালতের দীর্ঘদিনের রীতি অনুসরণ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গত ১৭ মে ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধি সংশোধন করে এর ৫৯ (এ) ধারায় ‘অবকাশ’ বা ভ্যাকেশনের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। নতুন এই সংশোধনী অনুযায়ী, প্রতি বছর দুই দফায় ট্রাইব্যুনাল অবকাশ যাপন করবে। প্রথমটি ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই এবং দ্বিতীয়টি ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে বিচারের গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি বিশেষ ধারাও রাখা হয়েছে—অবকাশকালীন সময়ে অন্তত একজন সদস্য বা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের জরুরি কার্যক্রম সচল রাখতে হবে। যদি কোনো সদস্য ছুটিতে কাজ করেন, তবে তিনি বছরের অন্য যেকোনো সময়ে সমপরিমাণ ছুটি কাটানোর সুযোগ পাবেন।

প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা কেবল সরকারি সাধারণ ছুটি এবং ব্যক্তিগত ছুটিই পেয়ে আসছিলাম। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ট্রাইব্যুনালের কাজের পরিধি ও চাপ বহুগুণ বেড়েছে। এই ছুটি বিচারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করতে সহায়তা করবে।” তিনি আরও জানান, অবকাশ চলাকালেও কাউকে গ্রেপ্তার করে আনা হলে কিংবা জরুরি জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন পড়লে তার জন্য বিশেষ বেঞ্চ বা ব্যবস্থা সচল থাকবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারও এই ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিচার কাজকে আরও গতিশীল করতে বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২ সক্রিয় রয়েছে। ইতিমধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের চারটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হয়েছে। আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় বিচার ব্যবস্থার এই নতুন ‘ক্যালেন্ডার’ বা সময়সূচি ট্রাইব্যুনালকে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামোর দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।