অন্ধকারে ধুঁকতে থাকা কক্সবাজারে অবশেষে আলোর দেখা! কীভাবে কাটল বিদ্যুৎ-সংকট?

টানা আট দিনের চরম লোডশেডিং ও সীমাহীন ভোগান্তির পর অবশেষে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ফিরতে শুরু করেছে স্বস্তি। ঈদুল আজহার দিন হঠাৎ করেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে পড়ায় পুরো শহর কার্যত অন্ধকারে ডুবে যায়। তবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নতুন একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার সফলভাবে চালুর পর সেখানকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। এর ফলে হাঁসফাঁস করা পর্যটক, দুশ্চিন্তায় থাকা হোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বস্তির সুবাতাস বইছে।


বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৮ মে শহরের কলাতলী বাইপাস সড়কের সাবস্টেশন বা উপকেন্দ্রে ১০/১৩ এমভিএ (MVA) ক্ষমতার একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার হঠাৎ করেই বিকল হয়ে যায়। এর পর থেকেই চরম বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে পড়ে কক্সবাজার। শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন কয়েক দফায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা লোডশেডিং করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সম্প্রতি একই উপকেন্দ্রে ১৬/২০ এমভিএ ক্ষমতার সম্পূর্ণ নতুন একটি ট্রান্সফরমার চালু করা হয়েছে, যার ফলে আগের সেই ভয়াবহ ভোগান্তি অনেকটাই কমে এসেছে।


ঈদের টানা ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও, এই আকস্মিক বিদ্যুৎ-সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট খাত। তীব্র গরমে এসি, লিফট ও অন্যান্য জরুরি সেবা চরমভাবে ব্যাহত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন বেড়াতে আসা পর্যটকেরা। হোটেলমালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কারণে অন্তত ৩০ হাজার পর্যটক তাঁদের নির্ধারিত সময়ের আগেই বুকিং বাতিল করে কক্সবাজার ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, যা পর্যটন অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা।


বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, নতুন ট্রান্সফরমারটি চালুর পর শহরে লোডশেডিংয়ের মাত্রা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে এসেছে। তাঁর ভাষ্যমতে, "আগে দিন ও রাত মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।"


সার্বিক বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণী গণমাধ্যমকে জানান, পুরো কক্সবাজার জেলা শহরে মাত্র একটি গ্রিড বা সঞ্চালন উপকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তাই গ্রিড বা সঞ্চালন লাইনে কোনো কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে নিরাপত্তার স্বার্থে বাধ্য হয়েই সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখে মেরামতের কাজ করতে হয়। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন, বর্তমানে কক্সবাজারে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই।


বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী সূত্রে এই সংকটের পেছনের কারণ সম্পর্কে জানা যায়, ঈদুল আজহার দিন কলাতলী উপকেন্দ্রের ওই ট্রান্সফরমারটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে পুরো শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। একে তো পর্যটকের উপচে পড়া ভিড়, তার ওপর ওই সময় কক্সবাজারের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ৪৫ মেগাওয়াট থেকে একলাফে বেড়ে ৫০ মেগাওয়াটে গিয়ে পৌঁছায়। এই বিশাল ঘাটতি সামাল দিতেই বিভিন্ন এলাকায় পালাক্রমে লোডশেডিং করতে হয়েছিল।


তবে দেশের শীর্ষ পর্যটন নগরীর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংকট নিরসনে দ্রুতগতিতে কাজ শুরু করে কর্তৃপক্ষ। গত ২৯ মে গাজীপুরের টঙ্গীতে থাকা কেন্দ্রীয় ভান্ডার থেকে ১৬/২০ এমভিএ ক্ষমতার নতুন একটি ট্রান্সফরমার আনার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। প্রায় ৪০ মেট্রিক টন ওজনের ওই বিশাল ট্রান্সফরমারটি ৩১ মে গভীর রাতে কক্সবাজারে এসে পৌঁছায়। পরে সড়ক বিভাগের বিশেষ সহায়তায় বাইপাস সড়কের ডিভাইডারের একটি অংশ ভেঙে সেটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উপকেন্দ্রে নেওয়া হয়। এরপর প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিশেষজ্ঞ কারিগরি দলের টানা কয়েক দিনের নিরলস প্রচেষ্টায় ট্রান্সফরমার স্থাপন, ‘ওয়েল সেন্ট্রিফিউজিং’, বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ‘কমিশনিং’ ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। চূড়ান্তভাবে গত শুক্রবার বিকেলে এই নতুন ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে শহরে ফের বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।


নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণী সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘পর্যটকদের দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।