মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে উদ্ভূত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং রাজধানীর তীব্র যানজট নিরসনে শিক্ষাব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। ঢাকা মহানগরীর নির্ধারিত কিছু নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে পাঠদান বা ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই নতুন নির্দেশনার আওতায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের মতো বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন গাইডলাইন ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহ থেকেই এই পরীক্ষামূলক বা ‘পাইলট প্রজেক্ট’ শুরু হতে যাচ্ছে। নতুন এই রুটিন অনুযায়ী—শনি, সোম ও বুধবার শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সশরীরে ক্লাস করবে। অন্যদিকে রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার পাঠদান চলবে অনলাইনে। শুক্রবার বরাবরের মতোই সাপ্তাহিক ছুটি থাকবে।
শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই নিয়ম এখনই সারা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হচ্ছে না। এমনকি সব মহানগরীতেও নয়; বরং যেসব প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ক্লাস নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এবং যেখানে বেশি মানুষের সমাগম হয়, কেবল সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্যই এই ব্যবস্থা। বিশেষ করে যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করে, সেসব এলাকায় যানজট ও জ্বালানি সাশ্রয় করতেই এই ‘ব্লেন্ডেড’ পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা কোনো ‘হার্ড অ্যান্ড ফাস্ট রুলে’ যাচ্ছি না এবং কাউকে বাধ্যও করছি না। এটি মূলত প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি প্রস্তুতি।”
উল্লেখ্য যে, পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরসহ টানা ৪০ দিনের লম্বা ছুটির পর গত ২৯ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় খুলেছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে জ্বালানি সাশ্রয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার পর এই প্রস্তাবনাটি সামনে আসে। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ছিল সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার, তবে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর বর্তমানের এই ‘তিন-তিন’ দিনভিত্তিক মিশ্র পদ্ধতিটি চূড়ান্ত করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অনলাইনে ক্লাস হলেও শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হবে এবং সেখান থেকেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদান পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই’ প্রদানের বিষয়টি নিয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘জিরো ডিউটি’ বা বিনা শুল্কে ইলেকট্রিক স্কুল বাস আমদানির সুযোগ দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল সাময়িক সংকট মোকাবিলায় নয়, বরং ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্মার্ট সিটিজেন তৈরির পথে এক মাইলফলক। শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, হুট করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না যাতে লেখাপড়ার মানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সবার সহযোগিতা ও পর্যায়ক্রমিক প্রস্তুতির মাধ্যমেই সারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এই আধুনিক ধারায় সম্পৃক্ত করার স্বপ্ন দেখছে সরকার।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।