প্রাথমিকের উপবৃত্তিতে বড় পরিবর্তন: কার পকেটে কত টাকা যাবে, জানিয়ে দিল অধিদপ্তর

দেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আজ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ‘প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। এই নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয় এবং শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে (এসকেটি) অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এই আর্থিক সহায়তার আওতায় আসবে।

নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এই উপবৃত্তির অর্থ কেবল নগদ সহায়তা নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ যেমন—বই-খাতা, স্কুল ব্যাগ, ছাতা, ড্রেস বা ইউনিফর্ম, জুতা এবং টিফিন বক্স কেনার জন্য ব্যয় করতে হবে। সরকারের ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’-এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই পুরো বিতরণ প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হবে।

কোন স্তরে কত টাকা বরাদ্দ:
নতুন এই কাঠামোর আওতায় প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির প্রত্যেক শিক্ষার্থী মাসিক ৭৫ টাকা হারে উপবৃত্তি পাবে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে একটি পরিবারের একজন শিক্ষার্থী পড়লে মাসে ১৫০ টাকা এবং দুজন শিক্ষার্থী থাকলে ৩০০ টাকা হারে বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে, সেখানে একজন শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ২০০ টাকা এবং একই পরিবারের দুজন শিক্ষার্থীর জন্য ৪০০ টাকা হারে উপবৃত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় এই টাকার পরিমাণ হ্রাস বা বৃদ্ধি করার ক্ষমতা সরকারের হাতে সংরক্ষিত থাকবে। উল্লেখ্য, একটি পরিবারের সর্বোচ্চ দুজন শিক্ষার্থী এই সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

উপবৃত্তি প্রাপ্তির কঠোর শর্তাবলি:
উপবৃত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এবার বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে অধিদপ্তর। প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ন্যূনতম বয়স ৪ বছর হতে হবে এবং মাসে অন্তত ৮০ শতাংশ পাঠদিবসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও ৮০ শতাংশ উপস্থিতির শর্ত বহাল থাকছে। তবে দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি শর্ত হিসেবে পূর্ববর্তী বার্ষিক পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে মানবিক কারণে এই নম্বর শিথিল করে ৩৩ শতাংশ করা হয়েছে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে নতুন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ‘ছাড়পত্র’ বা ট্রান্সফার সার্টিফিকেটে প্রাপ্ত নম্বরের উল্লেখ থাকা জরুরি।

প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা:
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে উপবৃত্তির টাকা সরাসরি অভিভাবকের মুঠোফোনে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীর অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (বাংলা ও ইংরেজি) থাকা আবশ্যক। এছাড়া সংশ্লিষ্ট অভিভাবকের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) দিয়ে নিবন্ধিত একটি সক্রিয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।

নির্দেশিকায় আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, কোনো শিক্ষার্থী যদি পরপর তিন মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে, তবে তাঁর উপবৃত্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে। নিয়মিত উপস্থিতির শর্ত ভঙ্গ করলেও সংশ্লিষ্ট মাসের টাকা পাওয়া যাবে না। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্কুলে আসা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসারের অনুমোদনক্রমে উপস্থিতির হার শিথিল করা হতে পারে। জুন মাসের উপবৃত্তির হিসাব হবে ১০ জুন পর্যন্ত উপস্থিতির ভিত্তিতে। মূলত প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করতেই সরকার এই বিস্তারিত ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।